জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫
মানুষের প্রতি মানুষের নির্মমতা, সামাজিক অবক্ষয়ের ঘন আঁধার, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পতন, সম্প্রীতির সূক্ষ্ম সুতো ছিঁড়ে যাওয়া, ভালোবাসা-বন্ধুত্ব-আন্তরিকতা হারিয়ে এক বিষণ্ন আত্মকেন্দ্রিক সমাজে পরিণত হওয়া— এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা, নাকি এগুলোর শিকড় কোথাও আরও গভীরে? কোথাও কি আমাদের সামষ্টিক মানসের কোনো এক স্তম্ভ ভেঙে পড়ছে?
আজ বাংলাদেশ যেন এক পচা-গলা নষ্ট সামাজিক বাস্তবতায় হাবুডুবু খাচ্ছে। ভাষার কদর্য ব্যবহার, বিলুপ্তপ্রায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর রাজনীতিতে শিষ্টাচারের চরম ঘাটতি। প্রশ্ন জাগে— কেন এমন হলো? কোন পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ? আগামী প্রজন্মের স্বদেশ কি হবে আরও বিপন্ন এক ভূখণ্ড?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ফিরে তাকাতে হয় আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তির দিকে— সেই শক্তি যা একটা জাতির আত্মা, চিন্তা, এবং নৈতিক অবয়ব গড়ে তোলে। একটি সমাজে যখন সাংস্কৃতিক আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন এর বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রজুড়ে।
১. সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট
সাংস্কৃতিক আন্দোলন কেবল গান-নাটক-কবিতা নয়; এটি একটি জাতির চেতনার বাহক— ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, এবং মূল্যবোধের ধারক। যখন এই ভিত্তি দুর্বল হয়, তখন মানুষ আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলে। পশ্চিমা বা প্রভাবশালী সংস্কৃতির অনুকরণে আত্মমর্যাদাবোধ বিলুপ্ত হয়, সৃষ্টি হয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতি। নিজের শিকড় ভুলে গিয়ে মানুষ হয় ভাসমান, বিচ্ছিন্ন এবং বিভ্রান্ত।
২. সৃজনশীলতার হ্রাস
সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষকে কল্পনাপ্রবণ ও মননশীল করে তোলে। নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, চিত্রকলা— এইসব মাধ্যমে প্রকাশ পায় সমাজের ভাবনা ও আত্মবিশ্বাস। কিন্তু যখন এই চর্চা স্তিমিত হয়, তখন সমাজে বিকাশ পায় একঘেয়ে অপসংস্কৃতি, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ এবং ভোগবাদী, বাজারনির্ভর এক বর্ণহীন চিন্তাজগত। সৃজনশীলতার জায়গা দখল করে নেয় নকল, বিকৃতি ও পণ্যায়ন।
৩. সহিংসতা ও অস্থিরতার বিস্তার
মানুষকে সহনশীল, যুক্তিবান ও সংবেদনশীল করে তোলে সাংস্কৃতিক চর্চা। সংস্কৃতিবান মানুষ নীতিনিষ্ঠ হয়, সহিংসতার পথ এড়িয়ে চলে। কিন্তু সংস্কৃতির জায়গা যখন ফাঁকা পড়ে, তখন সেখানে মাথা তোলে কুসংস্কার, গুজব, ঘৃণা, এবং উগ্রবাদ। ইতিহাস বলছে— যেসব সমাজে সংস্কৃতি নিস্তেজ হয়, সেখানে মৌলবাদ ও চরমপন্থা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে।
৪. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ক্ষয়
সাংস্কৃতিক আন্দোলন মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আলাপের জায়গা তৈরি, বিরুদ্ধমতকে সহ্য করার ক্ষমতা। সংস্কৃতি যত জীবন্ত থাকে, গণতন্ত্র তত প্রাণবন্ত হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্র ধ্বংস হলে এককেন্দ্রিকতা, কর্তৃত্ববাদ এবং দমননীতির চর্চা বেড়ে যায়। নাগরিক স্বাধীনতা তখন হয়ে পড়ে মুখবন্ধ ও শঙ্কাভিত।
৫. ভাষার ক্ষয় ও প্রজন্মগত বিচ্ছেদ
ভাষা ও সংস্কৃতি একে অপরের হাত ধরে চলে। যখন সাংস্কৃতিক আন্দোলন দুর্বল হয়, তখন ভাষাও কুৎসিত ও দেউলিয়া হতে শুরু করে। উপভাষা, লোককথা, আঞ্চলিক সাহিত্য হারিয়ে যায়। প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হয় বোঝাপড়ার দুরত্ব। ভাষার পরম্পরা ভেঙে গেলে জাতির মননও ধ্বসে পড়ে।
৬. অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অপচয়
সংস্কৃতি মানে কেবল মনন নয়, এটিও এক অর্থনৈতিক শক্তি। পর্যটন, হস্তশিল্প, লোকসংগীত, সিনেমা— সবই অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল যত প্রাণবন্ত হয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের পথ তত প্রশস্ত হয়। কিন্তু সাংস্কৃতিক চর্চা স্তিমিত হলে এসব খাতও মরে যায়, হারিয়ে যায় সম্ভাবনার দিগন্ত।
শেষ পর্যন্ত, একটি সমাজে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দুর্বলতা মানে শুধু শিল্পীদের কণ্ঠ স্তব্ধ হওয়া নয়— এটি পুরো জাতির আত্মিক ঘুম। যখন জাতির মন থেকে শিল্প, সাহিত্য ও সৌন্দর্যবোধ বিদায় নেয়, তখন সেখান থেকে উঠে আসে হিংসা, নিষ্ঠুরতা ও আত্মঘাতী পথ।
সুতরাং, সাংস্কৃতিক আন্দোলন কেবল একটি সেক্টরের নয়— এটি গোটা সমাজের প্রাণ। এর চর্চা মানে সমাজকে বাঁচিয়ে রাখা, ভবিষ্যতকে রক্ষা করা।
এখন প্রশ্ন হলো— আমরা কী সেই চর্চাকে ফিরিয়ে আনতে পারবো? নাকি নির্বাক থেকে সমাজের সর্বগ্রাসী পতনের সাক্ষী হবো?
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এন