নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ জুলাই ২০২৫
গোপালগঞ্জে এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার পর শহরে জারি রয়েছে কারফিউ। ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ নামে আলোচিত ওই কর্মসূচিকে ঘিরেই শুরু হয় উত্তেজনার সূত্রপাত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন— এই সহিংসতার দায় আসলে কার?
জুলাই আন্দোলনের পর নবগঠিত দল এনসিপি চলতি মাসের শুরু থেকেই দেশব্যাপী ‘জুলাই পদযাত্রা’ চালিয়ে আসছিল। তবে শুধুমাত্র গোপালগঞ্জের ক্ষেত্রেই এই দলটি তাদের কর্মসূচির নাম পরিবর্তন করে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ ঘোষণা করে ফেসবুকে।
এই ঘোষণার পর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম তার একাধিক ফেসবুক পোস্টে কর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখেন, “ধুমকেতুর মতো ছুটে আসুন।” অন্য একটি পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, “গোপালগঞ্জ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, গোপালগঞ্জ বাংলাদেশের।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘পদযাত্রা’ শব্দের পরিবর্তে ‘মার্চ’ ব্যবহার এক রাজনৈতিক কৌশল, যার মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত ‘উদ্দেশ্য’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জোবাইদা নাসরীনের ভাষায়, “‘মার্চ’ শব্দটি গতি, শক্তি এবং সংঘর্ষের দিকেই ইঙ্গিত করে। এটি কেবল ভাষাগত পরিবর্তন নয়, এর সঙ্গে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।”
গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচির আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমে নানা পোস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছিল। “গোপালগঞ্জ দখল”, “ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি ভেঙে ফেলার হুমকি”— এমন সব পোস্টে সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপির ঘোষণার ধরন এবং নেতাদের বক্তব্য অনেকের কাছেই উস্কানিমূলক বলে মনে হয়েছে।
বর্তমানে মানুষের পারসেপশন অনুমান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো ফেসবুক। একটি জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম বিবিসি বাংলার গোপালগঞ্জে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে এনসিপি’র দায় কতটা? শিরুনামের একটি নিউজ ফেসবুক পেজে পোস্ট করার পর প্রথম ১০০টি মন্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৯০ শতাংশ মানুষ গোপালগঞ্জের সহিংসতার জন্য সরাসরি এনসিপিকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, ফেসবুক পোস্টে ব্যবহার করা ভাষা এবং কর্মসূচির নাম সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তোলে।
অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন প্রশ্ন তোলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের একটি কর্মসূচিকে ঘিরে কেন সরকার এত সক্রিয় হল?” তিনি বলেন, এনসিপির মতো একটি দলকে এমন স্পর্শকাতর এলাকায় সমাবেশ করতে দেওয়া সন্দেহের জন্ম দেয়। তাঁর মতে, এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘বিরল এক নজির’।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এনসিপি রাজনৈতিকভাবে জুলাই মাসকে সামনে রেখে নিজেদের পরিচিতি ও আলোচনায় আনতে চেয়েছিল। গোপালগঞ্জকে বেছে নেওয়ার মধ্যে ছিল পরিকল্পিত কৌশল, যাতে স্পর্শকাতর আবেগ ও প্রতিক্রিয়া উসকে দিয়ে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায়।
রাজনীতি, পরিকল্পনা, উস্কানি নাকি শুধু মাত্র জনরোষ—গোপালগঞ্জের রক্তাক্ত ঘটনার দায় কে নেবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এ ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, “রাজনীতির নামে কেউ যদি সাধারণ মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলে, তবে তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক চর্চা হতে পারে না।”
খবরওয়ালা/এমএজেড