খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৩১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুইজন শিক্ষক ছাড়া বাকিরা সবাই শিশু। দুর্ঘটনার পর থেকেই নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি, লাশ গোপনের অভিযোগ এবং সরকারের গাফিলতা ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। সরকারের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, যা পরে ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে বিক্ষোভে রূপ নেয়। একপর্যায়ে তারা রাজপথে নেমে এসে নানা স্লোগানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে। লাশ নিয়ে গাফিলতি কেন? নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশে দেরি কেন?
ঘটনার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে। চট্টগ্রাম, যশোর, সিলেট, রাজবাড়ী, বরিশাল, নওগাঁ ও কুমিল্লায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও, সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও গায়েবানা জানাজা পালন করেছে।
দুর্ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এসময় মাইলস্টোন স্কুলের শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। দুপুর নাগাদ আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে যোগ দেন এবং দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করে তাদের ৯ ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। যদিও পরে পুলিশের সহায়তায় সন্ধ্যায় তারা মুক্ত হন।
অন্যদিকে, দুপুরের পর শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের তিন নম্বর গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। উভয়পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় অন্তত ৭৫ শিক্ষার্থী আহত হন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে সচিবালয় এলাকায় সেনা মোতায়েনের গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি তথ্যে প্রথমে নিহতের সংখ্যা বলা হয় ১৯, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হওয়ায় এ সংখ্যা ৩১-এ গিয়ে ঠেকে। তবে আইএসপিআর এবং সিএমএইচের তথ্যে পার্থক্য দেখা যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেহাবশেষ শনাক্তকরণে ডিএনএ পরীক্ষা চলায় নির্ভুল সংখ্যা প্রকাশে সময় লাগছে। তথ্য গরমিলের কারণে জনগণের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
ঘটনায় আহত হন দেড় শতাধিক মানুষ। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৬৮ জন, যাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সিঙ্গাপুর ও ভারতের চিকিৎসক দল ঢাকায় এসে চিকিৎসায় সহায়তা করছেন। গঠিত হয়েছে আটটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসক দল।
এই দুর্ঘটনা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। ক্রাউড কন্ট্রোলে ব্যর্থতা, নিহত শিশুদের রাষ্ট্রীয় সম্মান না দেওয়া, দেরিতে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা, পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ঘোষণায় বিলম্ব—সব মিলিয়ে সরকারের উপর জনরোষ বাড়ছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে ত্রাণ তহবিলে সহায়তার আহ্বান জানিয়ে দেওয়া ফেসবুক পোস্টটিও পরে সমালোচনার মুখে সরিয়ে নিতে হয়।
কবি টোকন ঠাকুর এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “একটা গণভোট হলে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংস্কারে ইউনূস সরকার ইন্টারিম হওয়ারও যোগ্য কিনা, কার্যকর ও সাবালক কিনা, জনতার মতামত উঠে আসতো।”
এই বক্তব্য দুর্ঘটনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আরও উসকে দিয়েছে।
উত্তরায় বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩১ জনের মৃত্যু, গুজব ও তথ্য গরমিল ঘিরে ছাত্রদের তীব্র বিক্ষোভ, উপদেষ্টা ও সচিবালয়ে হাঙ্গামা, সরকারের দেরি ও সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। জনগণ এবং বিশিষ্টজনেরা অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
খবরওয়ালা/এমএজেড