খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারব্যবস্থার ভেতরে এখনো ভয় কাটেনি বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, দেশে এখন এমন কেউ নেই যে বলতে পারে, ‘আমার কোনো ভয়ভীতি নেই’। বিচারব্যবস্থার ভেতরেও ভয়, বাইরেও ভয়—এই বাস্তবতায় বিচারকরা স্বাধীনভাবে রায় কিংবা আদেশ দিতেও ভয় পান।
বুধবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: এক বছরের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। আলোচনার শুরুতে উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সারা হোসেন বলেন, বিচারপতিরা চিন্তায় থাকেন—আমি কী করলে কে আমার বিরুদ্ধে কথা বলবে। কেউ যদি আওয়াজ তোলে, তাহলে তার বিচারিক ভবিষ্যৎ শেষ। এ অবস্থায় কে আদেশ বা রায় দেবে?
তিনি আরও বলেন, গত এক বছরে বিচারব্যবস্থার কাঠামোতে এমন কোনো পরিবর্তন আসেনি, যা নিয়ে গর্ব করা যায়। হাইকোর্টের বিচারকদের সরিয়ে দেওয়ার কারণ আজও অজানা। এসব বিষয়ে আলোচনা করাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। পত্রিকাগুলোও এ নিয়ে তেমন কিছু লিখছে না।
জুলাই-আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে যে ঢালাও মামলা হয়েছে, সে বিষয়ে সারা হোসেন বলেন, লাখ লাখ মানুষের নাম মামলায় জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এসব মামলা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। তিনি বলেন, সরকার দায় এড়িয়ে বলছে জনগণ মামলা করেছে, অথচ সরকারপক্ষের আইনজীবীরাও আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন না যে এটি অন্যায় হয়েছে। নিরপরাধ মানুষ মাসের পর মাস কারাবন্দি থাকছেন—এর দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিপক্ষকে দমন করা হচ্ছে। এমনকি জামিনও দেওয়া হচ্ছে না। অথচ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নয়, কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তারও দায় রয়েছে। ক্ষমতাধররা মনে করেন, নিজের অধিকার থাকলেও প্রতিপক্ষের নেই—এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হতে হবে।
বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য আদালতে অন্তত একটি ‘নিরাপদ জায়গা’ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, বর্তমান সরকারে যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেকেই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে ছিলেন। এখন তাঁরা বলছেন, জনগণকে বোঝানো যাবে না। অথচ তাঁরা সে চেষ্টাটুকু পর্যন্ত করেননি।
সংখ্যালঘুদের ওপর অন্যায় হলেও তারা ভয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীকেই দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে। আমরা কি সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি আর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলাম না? আজ আমরা তার অনেক দূরে অবস্থান করছি।
গোলটেবিল আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, গবেষক আলতাফ পারভেজ, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান, লেখক মাহা মীর্জা ও তরুণ গবেষক সহুল আহমদ প্রমুখ।
খবরওয়ালা/এন