খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইল সরকার একটি সুস্পষ্ট গণহত্যা চালাচ্ছে—এমন অভিযোগ এনেছে ইসরাইলভিত্তিক দুই শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা বতসেলেম ও ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস।
সোমবার (২৮ জুলাই) প্রকাশিত এক যৌথ প্রতিবেদনে তারা ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানকে পরিকল্পিত গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ইসরাইলকে থামানো দেশটির পশ্চিমা মিত্রদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় বেসামরিক লোকজনের পরিচয় ফিলিস্তিনি হওয়ার কারণেই কেবল প্রায় দুই বছর ধরে তাঁদের নিশানা করছে ইসরাইল। এর ফলে ফিলিস্তিনি সমাজে মারাত্মক—কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
এই দুই মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন প্রকাশের পর এবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কড়া বিবৃতি দিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস কালামার্ড বলেন, ‘ইসরায়েলের দুই মানবাধিকার সংস্থা বেতসেলেম ও ফিজিশিয়ান্স ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েল প্রথমবারের মতো সরাসরি বলল যে ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। এটি মানবাধিকার অঙ্গনের জন্য এক নতুন মাইলফলক, যা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েলি সরকার যখন ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কার্যক্রম দমন করার চেষ্টা করছে, তখন এই দুই প্রতিবেদনের প্রকাশ সাহসিকতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতির নিদর্শন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অবিলম্বে এই গণহত্যা বন্ধে এগিয়ে আসা, দখলদারির অবসান ঘটানো এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের আরোপিত বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, দীর্ঘমেয়াদি দখলদার ও বর্ণবাদী নীতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে যে প্রতিবেদন বেতসেলেম তুলে ধরেছে তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘আওয়ার জেনোসাইড’ বা আমাদের গণহত্যা। প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ড, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের জীবনযাপনের ধরন বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের নির্মূল করা হচ্ছে। এবং এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তাও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
বেতসেলেম সতর্ক করে বলেছে, গাজায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তার কিছু কৌশল পশ্চিম তীরেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। যদিও তা তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে তবুও তা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো যথেষ্ট। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোগত ধ্বংস এবং দখলের নীতিকে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফিজিশিয়ান্স ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েলের মেডিকেল-লিগ্যাল বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে পরিকল্পিতভাবে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। সংগঠনটির নিজস্ব চ্যালেঞ্জ, ভিজ্যুয়াল প্রমাণ ও ভুক্তভোগী ফিলিস্তিনিদের সাক্ষ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে—এই ধ্বংস যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি সুচিন্তিত নীতি, যার লক্ষ্য গাজার ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করা। এবং এটি গণহত্যারই একটি রূপ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসাকেন্দ্রে সরাসরি ও নির্বিচার হামলা চালানো হয়েছে, চিকিৎসা সহায়তা আটকে দেওয়া হয়েছে, মুমূর্ষু রোগীদের গাজা থেকে সরিয়ে নেওয়ার ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, এমনকি চিকিৎসকদের আটক, নির্যাতন এবং হত্যাও করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদন দুটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। অ্যামনেস্টি মহাসচিব বলেন, ‘এই নির্ভুল ও শক্তিশালী প্রতিবেদনগুলো সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলোর সামনে একটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা তুলে ধরেছে। আর সেই বাস্তবতা হলো—গাজায় যা ঘটছে, তা গণহত্যা।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবার বোঝা উচিত এখন আর লোক দেখানো বিবৃতি আর প্রতীকি বিতর্কের সময় নেই। এখনই কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
খবরওয়ালা/এসআর