খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
জুলাই আন্দোলনের এক বছর পার হতে না হতেই আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা অবৈধ আর্থিক লেনদেনসহ নানা ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
জুলাইকে ‘মানি মেকিং মেশিনে’ পরিণত করা হয়েছে, ফেসবুক লাইভে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমার দেয়া বক্তব্যের রেশ না কাটতেই এবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সাড়ে ৬ কোটি টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে।
তবে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে এ নিয়ে পাল্টা পোস্টে মাহফুজ আলম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এর আগে ঢাকার গুলশানে সাবেক এক এমপির বাসায় সমন্বয়ক পরিচয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটে। যা নিয়ে আলোচনা সমালোচনার মুখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি ব্যতীত সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেয়া হয়।
ওই ঘটনায় পুলিশের হাতে আটক হওয়া পাঁচজনকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। যাদের বিচার প্রক্রিয়া আদালতে চলমান।
এমন পরিস্থিতির কারণ হিসেবে অভিযুক্তদের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততাকেও দায়ি করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে।
কারণ নানা ধরনের অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে সরকারের কোনো শক্ত অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে নেতাদের বক্তব্য
অর্থ লেনদেনের সব শেষ অভিযোগটি এসেছে জুলাই আন্দোলনের নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তার ভাই জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম মাহির বিরুদ্ধে।
গত ২৮শে জুলাই বনি আমিন নামের একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সামাজিক মাধ্যমে দেয়া একটি পোস্টে দাবি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সাড়ে ছয় কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন । বিষয়টি নিয়ে এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
এরপরই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তার ভাই ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
যেখানে দাবি করা হয়, ‘একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অস্বচ্ছতার গুজব ছড়ানো হচ্ছে।’ এ প্রসঙ্গে নিজের অ্যাকাউন্টের গত ৬ মাসের বিবরণীও প্রকাশ করেন মি. মাহির।
উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘আমাদের এক বন্ধু একজন ব্যক্তিকে আমার ভাইয়ার সাথে দেখা করায়। বিটিভির একটা টেন্ডারের কাজ করে দিলে তারা পার্সেন্টেজ দিবে এবং জুলাই নিয়ে কয়েকটা দেশে প্রোগ্রামের জন্য হেল্প করবে। আমি জানার পর এটা নিষেধ করে দেই।’
‘আজকাল অনেকের লেজকাটা যাচ্ছে বলে, আমার বিরুদ্ধে লেগেছেন। নতুন একটি দলের কয়েকজন মহারথী এতে জড়িত।’
শুরুতে এভাবে পোস্ট দিলেও পরে কিছুটা বদলে ‘বিভিন্ন দলের কয়েকজন মহারথী এতে জড়িত’- এভাবে উল্লেখ করেন মি.আলম।
এর আগে গত ২৭শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমার একটি ফেসবুক লাইভ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।
যেখানে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে এসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত নানা ঘটনা ও তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সবগুলো সিদ্ধান্ত হেয়ার রোডে (উপদেষ্টাদের বাসভবন) বসে ঠিক করা হতো সেগুলোই বাস্তবায়ন হতো।’
উমামা তার ওই লাইভে বলেছেন, ‘জুলাই একটা অনেক বড় ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল৷ কিন্তু আমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র হওয়ার পর প্রথম আবিষ্কার করেছি যে, এগুলো দিয়ে লোকজন নানা কিছু করছে৷ আমার কখনো মাথায়ই আসেনি যে এগুলো দিয়ে টাকা-পয়সা ইনকাম করা যায়৷ তাহলে হোয়াই ইন দ্য আর্থ এটাকে আমি একটা মানি মেকিং মেশিনে পরিণত করতে যাব? কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়েছে।’
এর আগে গত মার্চ মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর কমিটির মুখপাত্র নাহিদ হাসান খন্দকারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
এই বছরের এপ্রিলে খুলনা নগরীতে একটি বাড়িতে ঢুকে গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি ও সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে চার শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে জনতা।
সোমবার ময়মনসিংহে জাতীয় নাগরিক পার্টির একটি সমাবেশে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘খুবই দুঃখজনক বিষয়, এনসিপির ব্যানার ব্যবহার করে অনেকে চাঁদাবাজিতে যুক্ত হচ্ছেন। আমাদের নেতা–কর্মী যাঁরা আছেন, আমরা মুখে মুখে বলব, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, কিন্তু আপনি গিয়ে করবেন চাঁদাবাজি—এই জিনিসগুলো কিন্তু আমরা বরদাশত করব না।’
এর একদিন আগেই রাজধানীর গুলশান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিনজন এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের এক নেতাসহ পাঁচজন।
এছাড়া ঢাকার ধানমণ্ডির একটি বাড়িতে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে মব হামলার পর আটককৃতদের থানা থেকে ছাড়িয়ে এনে আলোচনায় এসেছিলেন এনসিপির আরেকজন নেতা আব্দুল হান্নান মাসুদ। তাকেও গত মে মাসে ওই ঘটনার পর দল থেকে শোকজ করা হয়েছিলো।
গত বছর সেপ্টেম্বরে সাভারে সমন্বয়ক পরিচয়ধারী এক যুবককে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয়ার পর মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, দলবল নিয়ে একটি বাড়িতে তল্লাশির জন্য গিয়ে চাঁদা দাবি করেছিল সে।
এমনকি দুর্নীতির অভিযোগে জুলাই আন্দোলনের নেতাদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় যু্গ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে অবশ্য ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন সংগঠনের নেতারা। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক ও মুখপাত্র আরিফুল ইসলাম আদীব বলছেন, অভিযোগ পাওয়া মাত্র অন্তত চারটি ঘটনায় তারা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন।
কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসলে বা কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইনাম।
তিনি বলেন, ‘এরা সুযোগ সন্ধানী। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেই আমরা তাদের পদ স্থগিত করবো। বহিষ্কার করবো, প্রয়োজনে আইনের হাতে তুলে দিবো।’
অন্তর্বর্তী সরকারকে দায় দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা
গত আগস্টে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা সময় ছাত্র-জনতাকেই সরকারের নিয়োগকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনিসহ সরকারের অনেক উপদেষ্টা।
এছাড়া সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ও সংস্কার কমিশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও যুক্ত করা হয় গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র প্রতিনিধিদের অনেককে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত আগস্টে সরকারের এমন পদক্ষেপ ছিল ইতিবাচক। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সমন্বয়ক পরিচয়ে দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ এই পদক্ষেপকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, ‘সরকার তো শুরু থেকে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে একটা ইতঃস্তত ভূমিকা পালন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘একটা আদর্শ নিয়ে সবাই এই আন্দোলনে যোগ দিলেও যখন সরকার পরিবর্তন হলো, তখন একটা যে বিশাল পাওয়ার ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়ে গেল, তারপর এনাদের অনেকেই যে একটা ক্ষমতার জায়গাই চলে আসলেন, আমার ধারণা, দে কুড নট রিয়েলি আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট হাউ টু ইউজ দিস রেসপনসাবিলিটি (কীভাবে ক্ষমতা সামলাতে হবে হবে, সেটা তারা বুঝতে পারেননি)।’
ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকায় অনেকে কথিত সমন্বয়ক সেজে পরিস্থিতি সুযোগ নিয়েছে বলেও মনে করেন মি. শাহান।
সেই সাথে এসব দল বা সংগঠনগুলো নিজেদের কর্মীদের কতটা নজরদারী করতে পারছে, সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা।
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব যারা দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি কিংবা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ দুঃখজনক বলে মনে করেন শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খান।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক কালচার সেখান থেকে তারা একটা ভিন্ন কিছু উপহার দিবে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সেটার প্রতিফলন দেখছি না।’
যদিও কোনো ব্যক্তির দায় দলের ওপর চাপাতে চান না এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ বা উচ্চাকাঙ্খা যে কারো কারো মধ্যে তৈরি হয়েছে সেই কারণেই তারা কিন্তু এই ধরণের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছেন।’
তবে এক্ষেত্রে সরকারের দায় আছে বলেও মনে করেন মি. খান। তার মতে, ‘চাঁদাবাজির অভিযোগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আসছে। কোনো কোনো দল তাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু আইননানুগ পদক্ষেপ নেয়ার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের।’
সেইখানে আমরা যে মাত্রায় সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলাম বা করছি সেই মাত্রায় সরকারের ভূমিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি না, বলেন মি. খান।
সূত্র: বিবিসি
খবরওয়ালা/এমইউ