খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
আজ ৩০ জুলাই। বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতার জন্মদিন। জীবনের বাহাত্তরটি বসন্ত পেরিয়ে এই অনন্য অভিনয়শিল্পী আজও সমানভাবে স্মরণীয়, প্রাসঙ্গিক এবং প্রিয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে ‘অনঙ্গ বউ’, ‘গোলাপী’, কিংবা ‘অশনি সংকেত’-খ্যাত ববিতা একসময় ছিলেন রূপালি পর্দার অপরিহার্য মুখ। তাঁর সৌন্দর্য, অভিনয় নৈপুণ্য এবং নিপুণ চরিত্র উপস্থাপনা তাঁকে করে তুলেছে সত্তর ও আশির দশকের অন্যতম সফল ও শ্রদ্ধাভাজন নায়িকা।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই যশোরে জন্মগ্রহণ করেন ববিতা। তাঁর পুরো নাম ফরিদা আক্তার পপি। তবে চলচ্চিত্রে এসে তিনি ববিতা নামেই পরিচিত হন এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পৈতৃক বাড়ি যশোরে হলেও, পিতার বদলির চাকরির সুবাদে তাঁদের শৈশব কেটেছে বাগেরহাটে।
এক অভিনয়-সমৃদ্ধ পরিবারেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বড় বোন সুচন্দা এবং ছোট বোন চম্পা – দুজনেই ছিলেন বিখ্যাত অভিনেত্রী। ভাগ্নে চিত্রনায়ক ওমর সানি এবং সেই সূত্রে মৌসুমী তাঁর ভাগ্নেবউ। আবার চিত্রনায়ক রিয়াজ তাঁর চাচাতো ভাই এবং প্রখ্যাত নির্মাতা জহির রায়হান ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি যশোরের দাউদ পাবলিক বিদ্যালয়ে। তবে বড় বোন সুচন্দার চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর পরিবারসহ চলে আসেন ঢাকায়। গেন্ডারিয়ায় গড়ে ওঠে তাঁদের নতুন আবাস। যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষার সনদ নেই, তবু বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে করে তুলেছেন স্বশিক্ষিত ও আত্মবিশ্বাসী।
চলচ্চিত্রে আগমন
ববিতার অভিনয়জীবনের সূচনা ১৯৬৮ সালে, কিংবদন্তি পরিচালক জহির রায়হানের ‘সংসার’ ছবিতে শিশু শিল্পী হিসেবে। এখানে তিনি অভিনয় করেন রাজ্জাক ও সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে। এরপর তাঁর নাম বদলে যায়—ফরিদা আক্তার পপি থেকে হয়ে ওঠেন ‘ববিতা’।
নায়িকা হিসেবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘শেষ পর্যন্ত’, মুক্তি পায় ১৯৬৯ সালের ১৪ আগস্ট, যেদিন তিনি হারান তাঁর প্রিয়তমা মাকে। এই ট্র্যাজিক মুহূর্তটি যেনো জীবনের বাঁকবদলের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে থাকে তাঁর জন্য।
সাফল্যের শিখরে
গ্রামীণ মেয়ে থেকে শুরু করে শহরের আধুনিক নারী—প্রত্যেক চরিত্রে ববিতা ছিলেন সমান সাবলীল। বাণিজ্যিক ছবিতে যেমন ছিলেন সফল, তেমনি শিল্পমূল্যসম্পন্ন ছবিতেও রেখেছেন স্থায়ী ছাপ।
বাবুল চৌধুরীর ‘টাকা আনা পাই’ ছিল ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো ছবি। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্ত আসে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এই চলচ্চিত্রে তাঁর অনবদ্য পারফরম্যান্স তাঁকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
ববিতা অভিনীত স্মরণীয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে –
গোলাপী এখন ট্রেনে, নয়নমণি, অশনি সংকেত, দহন, লাঠিয়াল, ডুমুরের ফুল, সুন্দরী, বন্দিনী, মা, দিপু নাম্বার টু, পদ্মা মেঘনা যমুনা, রাতের পর দিন, জন্ম থেকে জ্বলছি, পিচ ঢালা পথ, কসাই, উত্তর ফাল্গুনী, রামের সুমতি, জীবন সংসার, বসুন্ধরা, চ্যালেঞ্জ, মিস লংকা, পোকা মাকড়ের ঘর বসতি প্রভৃতি।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
বাংলা চলচ্চিত্রে ববিতার অবদান নিঃসন্দেহে অনন্য। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বহু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একটানা তিনবার জাতীয় সেরা অভিনেত্রীর সম্মান, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি থেকে সর্বভারতীয় শ্রেষ্ঠ নায়িকা পুরস্কার, এবং বহু সরকারি-বেসরকারি সম্মাননা।
তিনি একমাত্র অভিনেত্রী যিনি সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
আজ তাঁর জন্মদিনে
ববিতা কেবল একজন অভিনেত্রী নন, তিনি আমাদের চলচ্চিত্র ইতিহাসের গর্ব, এক অনন্য অধ্যায়। অভিনয়ের নৌকায় পাল তুলে তিনি আজও ছুটে চলেছেন সময়ের ধারায়। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দর্শকের হৃদয়ে জীবন্ত থাকবে।
শুভ জন্মদিন কিংবদন্তি ববিতা!
আপনার জীবন হোক সুস্থ, সুন্দর ও সাফল্যে ভরপুর। আপনি দীর্ঘায়ু হোন।
খবরওয়ালা/এমএজেড