খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ৬ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন সোনিয়া নামের এক নারী। একপর্যায়ে স্বামীকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রেমিকের সহায়তায় টাকা দিয়ে ভাড়াটে খুনিকে দিয়ে স্বামীকে হত্যা করান। হত্যার পর মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় অন্য রাজ্যের একটি নর্দমায়। এরপর প্রেমিককে নিয়ে নতুন জীবনের প্রস্তুতিও শুরু করেন তিনি। কিন্তু স্বামীর মোবাইল ফোন এবং প্রেমিকের একটি ভুলে ফাঁস হয়ে যায় পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা।
নিহত ব্যক্তির নাম প্রিতম প্রকাশ। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা ছিল। দিল্লি পুলিশের অপরাধ শাখা তাঁকে খুঁজছিল। এক মামলায় তাঁকে পলাতক আসামি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রিতমকে খুঁজতে গিয়েই এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ও ষড়যন্ত্রের জট খুলে যায় পুলিশের।
প্রেমের টানে খুন
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ৩৪ বছর বয়সী সোনিয়া বলেন, মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি প্রিতমকে বিয়ে করেন, যিনি তাঁর চেয়ে আট বছরের বড়। তাঁদের একটি ছেলে ও দুটি মেয়ে রয়েছে। তাঁরা দিল্লির আলিপুর এলাকায় বসবাস করতেন।
সোনিয়া জানান, প্রিতম মাদকাসক্ত ছিলেন এবং একাধিক অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখা, ডাকাতি, অপহরণের মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন। নানা চেষ্টার পরও সোনিয়া তাঁকে মাদক ও অপরাধের পথ থেকে ফেরাতে পারেননি। উল্টো প্রিতম প্রায়ই মাদক সেবন করে বাসায় ফিরে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন।
২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিত নামের এক ক্যাবচালকের সঙ্গে পরিচয় হয় সোনিয়ার। রোহিতও পূর্বে অপরাধে জড়িত ছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং একসময় তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সোনিয়ার কাছে স্বামী প্রিতম হয়ে ওঠেন নতুন জীবনের পথে বাধা। তাই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
খুনের ছক ও বাস্তবায়ন
গত বছরের ২ জুলাই প্রিতমের সঙ্গে ঝগড়ার পর সোনিয়া দিল্লির পাশের হরিয়ানার সোনিপতের বোন দীপার বাসায় চলে যান। রোহিত তাঁকে সেখানে পৌঁছে দেন। সেই পথেই সোনিয়া রোহিতকে স্বামীকে খুন করার প্রস্তাব দেন। রোহিত নিজে খুন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ছয় লাখ রুপি দিলে একজন ভাড়াটে খুনি ভাড়া করা সম্ভব। তবে সোনিয়ার কাছে এত টাকা না থাকায় সেই মুহূর্তে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।
তবে ৫ জুলাই প্রিতম নিজেই সোনিয়াকে আনতে সোনিপতে যান। সেখানে আবার ঝগড়ার পর সোনিয়া চূড়ান্তভাবে স্বামীকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর বোনের স্বামীর ভাই বিজয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। বিজয় এক লাখ রুপির বিনিময়ে খুন করতে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার রুপিতে সমঝোতা হয়।
সেদিন রাতেই প্রিতমকে হত্যা করেন বিজয়। মরদেহ সাদা চাদরে মুড়িয়ে কাছের একটি নর্দমায় ফেলে দেন। ঘটনার সময় ঘরের নিচতলায় বিজয়ের সঙ্গে প্রিতমকে ঘুমাতে দেওয়া হয় এবং অন্যরা ছাদে ছিলেন।
চাপা দেওয়া হয় প্রমাণ, তারপরও ফাঁস
প্রিতমের ফোন রেখে দেন সোনিয়া। মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায়। এরপর সোনিয়া নিজেই দিল্লির আলিপুর থানায় স্বামী নিখোঁজ উল্লেখ করে একটি অভিযোগ করেন। ফোনটি ধ্বংস করতে তিনি রোহিতকে বলেন, কিন্তু রোহিত তা না করে ব্যবহার করতেই থাকেন।
প্রিতমের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় দিল্লি পুলিশের অপরাধ শাখা তাঁকে খুঁজছিল। ফোন ট্র্যাক করে পুলিশ জানতে পারে, সেটি হরিয়ানার সোনিপতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সূত্র ধরে রোহিতের উপর নজরদারি শুরু হয়। একপর্যায়ে রোহিতকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদে খুনের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে নেন তিনি।
স্ত্রীর স্বীকারোক্তি ও গ্রেপ্তার
রোহিতের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় সোনিয়াকে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে খুনের দায় স্বীকার করেন তিনি। সোনিয়া জানান, বিজয়কে ৫০ হাজার রুপি দিয়েছেন এবং প্রিতমের গাড়ি ২ লাখ ৮০ হাজার রুপিতে বিক্রি করে কিছু টাকা রোহিতকে দেন।
তিনি আরও জানান, হত্যার পর বিজয় একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছিলেন, যেখানে প্রিতমের মরদেহ ফেলে দেওয়ার দৃশ্য ছিল। দিল্লি পুলিশের অনুরোধে হরিয়ানার পুলিশ জানায়, নর্দমা থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
বর্তমানে সোনিয়া ও রোহিত কারাগারে রয়েছেন। বিজয়ও আগের একটি চুরির মামলায় কারাগারে আটক।
শেষে পুলিশ বলছে—
প্রেম আর স্বামীর প্রতি ঘৃণা মিলে রচিত হয়েছিল এক নারকের গল্প। কিন্তু মোবাইল ফোনের একটি ছোট ভুলেই ভেঙে পড়ে সমস্ত পরিকল্পনার দেয়াল।
খবরওয়ালা/এসআই