খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ৯ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক হার ২৫% থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০%-এ। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বিপাকে পড়ে বিকল্প বাজার ও সমাধান খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
যারা এতদিন আমেরিকান ভোক্তাদের সাশ্রয়ী দামে পণ্য সরবরাহ করে লাভবান হয়েছিলেন, এখন তারা ব্যবসায়িক কৌশল পরিবর্তন ও নতুন রপ্তানি গন্তব্য অনুসন্ধানে মনোযোগ দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০% শুল্ক আরোপের ফলে মার্কিন বাজারে এসব পণ্যের দাম হঠাৎ করেই আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণ বলছে, এই পদক্ষেপ ভারতের রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা আনতে পারে এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ট্রাম্পের শুল্ক: ‘কোভিডের চেয়েও খারাপ’
পোশাক রপ্তানিকারক টুয়েন্টি সেকেন্ড মাইলসের প্রতিষ্ঠাতা ললিত থুকরাল বলেছেন, ‘এই পরিস্থিতি আমাদের কাছে কোভিডের চেয়েও খারাপ।’ এই বর্ধিত শুল্কের কারণে লোকসানে পণ্য বিক্রি করার বিষয়ে থুকরাল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ক্রমবর্ধমান শুল্ক টোয়েন্টি সেকেন্ড মাইলসের মতো ছোট ব্যবসার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে, তাই বড় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কৌশল অন্বেষণ করছে, যার মধ্যে রয়েছে কম শুল্ক হারযুক্ত দেশগুলোতে উৎপাদন স্থানান্তর, বিভিন্ন বাজারে গ্রাহক খোঁজা এবং সম্ভাব্য মার্কিন-ভিত্তিক অধিগ্রহণের দিকে নজর দেয়া। গোকালদাস এক্সপোর্টস লিমিটেড, যা মার্কিন বাজার থেকে তার আয়ের প্রায় ৭০% সংগ্রহ করে এবং ভারতের বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে একটি, তারা কেনিয়া এবং ইথিওপিয়ায় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করেছে, যেখানে মার্কিন শুল্ক মাত্র ১০%।
গোকালদাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিবরামকৃষ্ণান গণপতি ব্লুমবার্গকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আফ্রিকা ব্যবসা পরিচালনা করার একটি ভালো উৎস বলে মনে হচ্ছে। আমরা আমেরিকান গ্রাহকদের কাছ থেকে ওই অঞ্চলে উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ অনুসন্ধান দেখতে পাচ্ছি।’
ট্রাম্পের শুল্ক ভারতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে?
রপ্তানিকারকরা যখন অন্যান্য বাজারে উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন, তখন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে এবং চীনের বিপরীতে উৎপাদন বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ভারতের আকাঙ্ক্ষাকে আঘাত করতে পারে। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে, ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন ১% পর্যন্ত কমাতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ একদিকে যেমন আক্রমণাত্মক তেমনি প্রেসিডেন্টের মুখে শোনা গেছে ভারতের সমালোচনা। তিনি যেখানে ভারতের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাগুলোকে ‘ঘৃণ্য’ এবং এর অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও এর প্রেক্ষিতে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জোর দিয়ে বলেছেন যে, ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হয়ে উঠছে।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আশা করছে যে সরকার তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। পোশাক, রত্ন ও অলংকার এবং চিংড়ি রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিত্বকারী বাণিজ্য সংগঠনগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে সরকারি সহায়তা চাইছে। ভারতীয় টেক্সটাইল শিল্পের কনফেডারেশন স্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারকদের সহায়তা করার জন্য দ্রুত সরকারি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। অন্যদিকে চিংড়ি রপ্তানি খাত ‘রপ্তানি প্রণোদনা’ প্রকল্পের জন্য অনুরোধ করছে। রত্ন ও জুয়েলারি রপ্তানি উন্নয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান কিরিট বনসালি শুল্ক ছাড়, প্রি-শিপমেন্ট ঋণ এবং কার্যকরী মূলধনের সুদ স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়ে একটি বিবৃতি জারি করেছেন। পাবলিক পলিসি কনসালটেন্সি দ্য কোয়ান্টাম হাবের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার রোহিত কুমারের মতে, ‘চীনের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ভারতের অবস্থানকে মার্কিন শুল্ক একটি তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।’
সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন প্রচেষ্টার বিষয়ে কুমারের মূল্যায়ন অনুসারে, নীতি কাঠামো বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।
ব্লুমবার্গের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ চেতনা কুমার এবং অ্যাডাম ফারারের বিশ্লেষণ বলছে, ‘অতিরিক্ত ২৫% তেল জরিমানা শুল্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রগামী রপ্তানিতে ৬০% আঘাত হানবে, যার ফলে জিডিপি ০.৯% হ্রাস পাবে। এই শুল্কের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হবে রত্ন ও গয়না, টেক্সটাইল, পাদুকা, কার্পেট এবং কৃষি পণ্য- যা সবই শ্রম-নির্ভর’।
ভারতের রাশিয়ান তেল ক্রয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরোপিত নতুন ২৫% মার্কিন শুল্ক ২১ দিনের মধ্যে কার্যকর হবে, যার ফলে নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটন ডিসির মধ্যে গভীর কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হতে পারে।
সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া
খবরওয়ালা/টিএসএন