খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ৯ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গত বছরের ৫ আগস্ট নোয়াখালীর চাটখিলে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন হাটপুকুরিয়া ঘাটলাবাগ ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের যুবক ইমতিয়াজ হোসেন (২২)। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরে বাবার আবেদনের পর ইমতিয়াজকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়। তবে অভ্যুত্থানের দিন নিহত হলেও তার মৃত্যু নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনে ইমতিয়াজের কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ নেই। তাদের দাবি, থানা থেকে লুট করা অস্ত্র থেকে দুর্ঘটনাবশত গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। অথচ এই সুযোগে তার বাবা মো. হাবিবুর রহমান সরকারি সুযোগ-সুবিধা আদায় ও মামলা বাণিজ্য করছেন।
স্থানীয়দের বর্ণনায়, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে চাটখিল পৌরবাজারে আনন্দ মিছিলে অংশ নেন ইমতিয়াজ। ওইদিন বিকেলে চাটখিল থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। কিছু সময় পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ইমতিয়াজ জানিয়েছিলেন, বন্ধুদের কেউ তাকে গুলি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, থানার অস্ত্র লুটের পর কোমরে রাখা অস্ত্র থেকে দুর্ঘটনাবশত গুলি বের হয়ে তিনি আহত হন। পরদিন ভোরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর প্রায় দুই মাস পর, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমান ছেলেকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আবেদন করেন। পরে ২০২৫ সালের ২১ মে ৫৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলা থেকে নাম কাটার বিনিময়ে তিনি অর্ধকোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়েছেন।
এ বিষয়ে বুধবার (৬ আগস্ট) জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে ২৭ মার্চ তারা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট বাতিলের দাবি জানান। তাদের বক্তব্য, ইমতিয়াজ ছিলেন একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি ম্যান। সরকার পতনের খবর শুনে বন্ধুদের সঙ্গে থানায় ঢুকে অস্ত্র লুট করেন এবং দুর্ঘটনায় নিজের অস্ত্রের গুলিতে নিহত হন। আন্দোলনে তার সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ, ছবি বা ভিডিও নেই।
আবেদনে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, হাবিবুর রহমান যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি উৎস থেকে অর্থ গ্রহণ করে অপব্যবহার বা আত্মসাৎ করে থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
আবেদনে স্বাক্ষরকারী নোয়াখালী সরকারি কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম রনি বলেন, ‘ইমতিয়াজের মৃত্যুকে শহীদ বানিয়ে তার বাবা হাবিবুর রহমান গেজেটভুক্তির মাধ্যমে সরকারি সুযোগ-সুবিধা আদায় করেছেন। মামলার ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়সহ ৭০-৮০ লাখ টাকা ও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে আরও ১৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তার বাবার ‘জুলাই বাণিজ্য’ নিয়ে আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করলে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেব।’
চাটখিল উপজেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাবিবুর রহমান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে প্রভাব খাটিয়ে ছেলেকে শহীদ বানানোর চেষ্টা করছেন এবং মানুষকে মামলার ভয় দেখাচ্ছেন।
তবে হাবিবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। থানার অস্ত্র লুট করেছে মেনে নিলাম, কিন্তু কোমরে অস্ত্র থাকলে পায়ে বা মাথায় গুলি লাগার কথা, পেটে গুলি লাগার নয়।” তিনি ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেন।
নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, ইমতিয়াজের বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার পরিবারকে সব ধরনের সরকারি সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থেকে বিরত রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষে নেওয়া হবে।