খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট ২০২৫
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে আলো ছড়ানো এক বলিষ্ঠ অভিনেত্রী ছিলেন সন্ধ্যারানী। পর্দায় ছিলেন প্রাণবন্ত, আর জীবনের শেষ অধ্যায়ে হয়ে ওঠেন এক শান্ত, নির্জন সন্ন্যাসিনী—যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানানো এক বাস্তব কাহিনি।
১৯২৫ সালের ১১ আগস্ট কলকাতার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম তাঁর। পৈতৃক পদবি ছিল ‘ঘোষ’। পিতা-মাতার নাম জানা যায় না। স্বামী অলোক চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সংসার করেছিলেন।
১৯৪৮ সালের দৃষ্টিদান চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের নায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে তাঁর। তখনই চলচ্চিত্রপ্রেমীরা চেনেন তাঁকে—প্রতিভাবান, পরিপক্ক, নান্দনিক এক অভিনেত্রী হিসেবে। ১৯৫৭ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড়দিদি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে নাম ভূমিকায় তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করেছিল দর্শকদের। উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন ছড়িয়ে দিয়েছিল নির্মল প্রেমের আবহ। পৃথিবী আমারে চায় ও মায়ামৃগ-এও তাঁদের যুগল উপস্থিতি ছিল স্মরণীয়।
সুচিত্রা সেনের সঙ্গে উত্তম কুমারের জনপ্রিয় যুগলবন্দীর আগেই নায়িকা ছিলেন সন্ধ্যারানী। তবে বয়সের পার্থক্য ও দর্শকের মনোভাবের কারণে সেই জুটি তেমন সাড়া ফেলেনি। উত্তম কুমার তাঁকে স্নেহভরে “দিদি” বলে ডাকতেন।
নায়িকা ছাড়াও পার্শ্বচরিত্রে তাঁর ছিল অগণিত স্মরণীয় কাজ—প্রায় ১৭০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। সাত নম্বর, জনতার আদালত, দাদা মনি, মায়ের প্রাণ, অঘটন আজো, রাখী, সংগ্রাম, মা ও মাটি, নন্দিনী, দীপ নেভে নাই, অপরাহ্নের আলো, নূপুর, কপালকুণ্ডলা, মহানগর, বন্দিনী, বৈকুন্ঠের উইল, অভিমান, পথের সাথী, প্রতিশোধ, শ্রীমতী হংসরাজ, স্বপ্ন সাধনা, ব্রতচারিণী, কঙ্কাবতীর ঘাট—তালিকা শেষ হয় না।
তবে ব্যক্তিজীবনে ছিল গভীর বেদনাময় অধ্যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর মাথার সমস্ত চুল কেটে, দীনহীন বেশে, একান্তে হয়ে ওঠেন ধর্মপরায়ণ সন্ন্যাসিনী। শিল্পী সমাজে মানবিকতার প্রতীক হিসেবেও ছিলেন তিনি—১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় নিজের বাড়িতে এক মুসলিম পরিবারকে আশ্রয় দিয়ে কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের স্থানে আসীন হয়েছিলেন।
১৯৯৯ সালের ১৯ জুলাই, ৭৪ বছর বয়সে কলকাতার সিটি নার্সিং হোমে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে দাহকার্য সম্পন্ন হওয়ার পরেই প্রকাশিত হয় মৃত্যু সংবাদ।
অভিমানী অথচ আলোকোজ্জ্বল এই অভিনেত্রীর জীবনকাহিনি জানলে বিস্ময় জাগে—জীবনের শেষ প্রহরে নীরব সন্ন্যাসিনী, অথচ স্মৃতিতে তিনি আজও বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য নক্ষত্র।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
খবরওয়ালা/এন