আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫
ভারতের বিরুদ্ধে ৪০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের বিষয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে শরণার্থীদের দেওয়া তথ্য ও তাদের স্বজনদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমানে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে এবং জাতিসংঘ বলছে, ভারত এই রোহিঙ্গাদের জীবনকে ‘চরম ঝুঁকির’ মুখে ফেলে দিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯ মে নূরুল আমিন তার ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারেন যে তার ভাই খাইরুলসহ পরিবারের আরও চারজনকে ভারত সরকার মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে। এই পরিবারটি বহু বছর আগে মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।
দিল্লিতে থাকা আমিন বলেন, তার বাবা-মা ও স্বজনরা যে যন্ত্রণার মধ্যে আছেন, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না।
বিবিসি এই ৪০ জন রোহিঙ্গাকে খুঁজে পেয়েছে, যারা এখন মিয়ানমারের একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠী বাহটু আর্মির (বিএইচএ) কাছে আশ্রয় নিয়েছে। ভিডিও কলে সৈয়দ নূর নামের একজন শরণার্থী জানান, তারা সেখানে নিরাপদ নন, কারণ পুরো এলাকা একটি যুদ্ধক্ষেত্র।
শরণার্থীরা, তাদের স্বজন এবং বিশেষজ্ঞদের তথ্যের ভিত্তিতে বিবিসি ঘটনার একটি ধারাবাহিক চিত্র তৈরি করেছে। তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি থেকে তাদের বিমানে করে বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে করে আন্দামান সাগরে ফেলে দেওয়া হয়, যদিও তাদের লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা সাঁতরে তীরে ওঠেন।
জন নামে একজন রোহিঙ্গা তার ভাইকে ফোনে জানান, তাদের হাত বেঁধে, চোখ-মুখ ঢেকে জাহাজে তুলে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নূরুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি ভারতের সরকারের মধ্যে কোনো মানবতা দেখেননি।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক টমাস অ্যান্ড্রুজ বলেন, এসব অভিযোগের পক্ষে তার কাছে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ রয়েছে এবং তিনি এই সংক্রান্ত প্রমাণ ভারতের কাছে জমা দিলেও কোনো উত্তর পাননি। বিবিসিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পায়নি।
ভারতে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটি তাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, বরং ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচনা করে। ভারতে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ রোহিঙ্গা ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধিত হলেও, প্রকৃত সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের পর লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ মে দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় বসবাসকারী ৪০ রোহিঙ্গাকে স্থানীয় থানায় ডেকে ছবি ও আঙুলের ছাপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে তাদের ইন্দরলোক আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। আমিন জানান, তার ভাই তাকে ফোন করে বলেন যে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
৭ মে তাদের হিন্দন বিমানবন্দর থেকে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়, যেখানে তাদের নৌবাহিনীর লেখা বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয়। সৈয়দ নূর জানান, বাসে তাদের হাত বেঁধে মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর নৌবাহিনীর একটি বড় যুদ্ধজাহাজে তাদের প্রায় ১৪ ঘণ্টা রাখা হয়। এ সময় অনেককে মারধর ও অপমান করা হয়। ফয়াজ উল্লাহ তার হাতে আঘাতের দাগ দেখিয়ে জানান, তাকে ঘুষি, চড় ও বাঁশ দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।
৪০ জনের মধ্যে ১৫ জন খ্রিস্টান রোহিঙ্গাকে ধর্ম পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন করা হয় এবং তাদের খতনা পরীক্ষা করা হয়। এমনকি একজনকে কাশ্মীরের পেহেলগাম হামলায় জড়িত বলে মিথ্যা অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
৮ মে সন্ধ্যায় তাদের ছোট রাবারের নৌকায় তুলে সমুদ্রে নামতে বাধ্য করা হয় এবং বলা হয় তারা ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছেন। কিন্তু আসলে তারা মিয়ানমারে ছিল। পরদিন ভোরে স্থানীয় জেলেরা তাদের উদ্ধার করেন।
১৭ মে নূরুল আমিন ও তার এক আত্মীয় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করেন, যেখানে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনা, নির্বাসন বন্ধ করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তবে একজন বিচারপতি এই অভিযোগকে ‘অবাস্তব কল্পনা’ বলে মন্তব্য করেন। মামলার পরবর্তী শুনানি ২৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত হয়েছে।
নূরুল আমিন বলেন, তিনি সবসময় এই ভয়ে থাকেন যে ভারত সরকার যে কোনো সময় তাদেরও ধরে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবে।
জাতিসংঘের অ্যান্ড্রুজ বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে ভারতে এসেছিল, তারা সেখানে থাকতে চায়নি।
খবরওয়ালা/টিএসএন