মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
আমাদের বাপ-চাচারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা পেরিয়ে লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা আর মা–বোনদের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে। যে সোনালী স্বপ্ন নিয়ে তারা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন, নানা কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে সেই যুদ্ধকে গণ্ডগোলের বছরের তকমা দিয়ে শুরু থেকেই তাকে কলুষিত করার চেষ্টা করে এসেছে একটা অপশক্তি।
আর আমাদের শৈশব, কৈশোর বয়সটা নানা সরকারের শাসনামলে পাঠ্যবইয়ে আর রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডার যাতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হতে হতে ইতিহাস বিকৃতির চরম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে আমরা কনফিউজড তরুণ হয়েই বেড়ে উঠেছি। ফলে অনেক কিছুর বিনিময়ে পাওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের অগ্রজরা হানাদার বাহিনীর কবল থেকে ছিনিয়ে আনতে পারলেও স্বাধীনতার শুরু থেকেই এমন বিজয়ে অসন্তুষ্ট গোষ্ঠীর নোংরা খেলায় আমরা বারবার হেরে গেছি প্রবাহমান নষ্ট রাজনীতির কারণে।
নব্বই দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে যুবক হিসেবে মিছিল, সমাবেশ, নাটক, কবিতায় সোচ্চার ছিলাম স্বৈরাচার এরশাদের পতনকে সবাই মিলে পদদলিত করার স্বপ্নে বিভোর হয়ে। পতন এনেছি ঠিকই, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের সুফল আজও অধরাই রয়ে গেছে। কালের পরিক্রমায় আমাদের দেশে গায়ের জোরে জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র মালিকানার দাবিদার দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের অন্যতম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা ও নিজেকে জাতির একমাত্র সম্রাজ্ঞী মনে করা সেই জাতির পিতার উত্তরসূরী। প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান একতরফাভাবে বাতিল করে কখনো ভোটারবিহীন নির্বাচন, কখনো দিনের ভোট আগের রাতেই চুরি, আবার আমি, তুমি, ডামি মার্কা নির্বাচন করে দীর্ঘ পনের বছর গায়ের জোরে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে চরম দাম্ভিকতা, মারাত্মক দুর্নীতি, নৈরাজ্য আর ভয়ংকর লুটপাটের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে থাকে তার নেতৃত্বে থাকা এই দলটি। ফলে চাকরিতে কোটা বন্ধের ছাত্র আন্দোলনের ঘটনা দিয়ে শুরু হলেও তার দীর্ঘ শাসনামলের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে দেশের বিক্ষুব্ধ তরুণ সমাজ। যাদের আহ্বানে সাড়া দেয় বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ দেশের আপামর জনতা। নানা ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে তরুণদের সাথে সাথে আমার মতো অসংখ্য সাধারণ নাগরিকও যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিগত বছরের জুলাই–আগস্ট মাসে সন্তানদের সাথে তাদের পিতামাতা, অভিভাবকেরাও রাজপথে নেমে আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। অসংখ্য তরুণের তাজা প্রাণের বিনিময়ে অবশেষে বিজয় ছিনিয়ে আনা গেলেও এখানেও যে আওয়ামী ছাত্রলীগের মুখোশের আড়ালে দেশবিরোধী একটা কুচক্রী মহল তাদের মেটিকুলাস পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক কিছু করছে, তা আমরা আমজনতা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি!
ফলে এমন একটা অভ্যুদয়ের পরও বিজয়ের মহা আনন্দের মাঝে শুরু হয় নিজেদের মধ্যে কৃতিত্ব নেয়ার বাহাদুরি দেখানোর প্রতিযোগিতা। এই অবস্থা দেশবিরোধী পরাজিত শক্তিকে তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনেক বেশি সুযোগ তৈরি করে দেয়। নিজেদের মধ্যে তিক্ততা ও বিভাজনের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সামনের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বদলে উল্টো দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ রচিত হতে থাকে। এর ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জায়গায় দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে ভয়ংকর মব কালচার। দেশের ভেতরে ও বাইরে একদল কুচক্রী মহল যেভাবে পুতুলনাচের মতো ধর্মান্ধ একটা বড় জনগোষ্ঠীকে নাচাচ্ছে, অজ্ঞাত কারণে তাদেরকে বড় পীর, আউলিয়া বা দরবেশ মনে করে দেশের সেই জনগোষ্ঠী নিজস্ব বিচার–বিবেচনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে তাদের কথাতেই যেন উঠবস করছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে বাস্তবে কোনো সরকারের অস্তিত্ব আছে কিনা সেটাও বুঝতে সচেতন জনগণের অনেক সময় কষ্ট হচ্ছে!
এমন অবস্থা তৈরি করে আসল মজাটা নিচ্ছে সবখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সেইসব যুদ্ধাপরাধী ধর্মব্যবসায়ী ও তাদের নতুন প্রজন্মের উত্তরসূরীরা। যার একটা বড় উদাহরণ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক কালের ডাকসু নির্বাচন। রাজনীতিতে ঘাপটি মেরে থাকা তরুণদের একটা বড় অংশ বিগত সরকারের দোর্দণ্ড দাপটের মধ্যে থাকা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাঝে মিশে গিয়ে একদিকে যেমন তাদেরকে হটিয়ে দেয়ার খেলায় দারুণ সফলতা দেখিয়েছে, সেই গেমের ধারাবাহিকতায় ও কৌশলের খেলায় ডাকসুতে ভূমিধস বিজয়ও তারা ছিনিয়ে নিয়েছে নিরঙ্কুশভাবে, অথচ যাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশিরভাগ ক্যাম্পাসে। অন্য সকল ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব–সংঘাত সৃষ্টি করার কৌশলকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটা তারাই ঘটিয়ে দেখিয়ে দিল এক ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে।
জিতলো ওরা, কিন্তু এখন আলোচনা হচ্ছে ছাত্রদল তথা বিএনপি আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনভুক্ত সংগঠন এনসিপি, বাগছাস প্রমুখ দলগুলোকে নিয়ে। এত বড় একটা আন্দোলনের মাত্র এক বছর পর যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় নেতৃত্বে থাকার কথা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর, সেখানে অভ্যন্তরীণ বিবাদে জড়িয়ে ও বহুধা বিভক্তির ফলে সবচেয়ে কম ভোট পেল তারাই। অথচ, বাংলাদেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের সুযোগ তারাই তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই পুরোনো দাম্ভিকতা ও উন্নাসিকতার সনাতনী ধারা থেকে তারাও বেরিয়ে আসতে পারেনি। বরং তারা এমন একটা উচ্চতায় নিজেদেরকে প্রতিপন্ন করা শুরু করে দিল যে, টিভির বিভিন্ন টকশোতে এসে সিনিয়র ও প্রাজ্ঞ আলোচকদের সাথে প্রতিনিয়ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ প্রদর্শনপূর্বক কথা বলা, ছাত্রজীবন শেষ হতে না হতেই বিলাসবহুল গাড়ি–বাড়িসহ নানা সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রতিযোগিতার খবর তাদেরকে দিনদিন কালিমালিপ্ত করে তুলেছে। তাদের আহ্বানে আগের মতো সাধারণ মানুষ আর ছুটে আসে না!
অন্যদিকে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভয়ংকর ভরাডুবির প্রেক্ষিতে তাদের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের কাছ থেকেই এখন উঠে আসছে অনেক যৌক্তিক সমালোচনা। বিশেষ করে বিগত বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে এই দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মীর অস্বাভাবিক অহমিকা, দাম্ভিকতা ও দেশজুড়ে উচ্ছৃঙ্খল একটা গোষ্ঠীর দুর্ধর্ষ ও ছিঁচকে এই দুই ধরনের মাস্তানি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী তৎপরতা মূল দলটিসহ এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনগুলোকে আওয়ামী লীগের সাথে তুলনীয় করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। একদিকে এই দলের নেতাকর্মীদের মাঝে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখাপড়ার প্রতি খুব একটা আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না, যা তাদের বিভিন্ন মাধ্যমের কথাবার্তায় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। আবার এই ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রযুক্তিগত কলাকৌশলেও যে তারা অনেক বেশি পিছিয়ে আছে সেটাও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় পিনাকী, ইলিয়াস, কনক সারওয়ারদের মতো শক্তিশালী ইনফ্লুয়েন্সার গ্রুপ যেমন তারা তৈরি করতে পারেনি, সেইসাথে কিছু তথাকথিত ধান্দাবাজ ছাড়া দেশে সত্যিকারের শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, একাডেমিক—এসব ক্ষেত্রে গুণী মানুষদের প্রতি তাদের সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ কখনো খুব একটা গুরুত্ব দেয় বলে মনে হয় না। ফলে তাদের বলা কথাবার্তায় যেমন সনাতনী ছাপ খুব বেশি প্রকট, একইসাথে অনেক সিনিয়র নেতাকর্মীর গোয়ার্তুমি স্বভাবের কারণে ক্রমশ তারা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে!
বিএনপি ও বৈষম্য ঘরানার নেতাকর্মীদের এই উচ্ছনে যাওয়া সময়টার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করছে সেই দূরদর্শী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াত–শিবির চক্র। সাম্প্রতিক কালের ডাকসুতে তাদের আকাশচুম্বী বিজয় তার সর্বশেষ উদাহরণ। যা তাদেরকে আগামী দিনে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে!
ডাকসুর অভিজ্ঞতা থেকে যথাযথ শিক্ষা গ্রহণ ও কার্যকর মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিগত বছরের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনে হিরো বনে যাওয়া তরুণ নেতৃবৃন্দের অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ড, আর নিজেদেরকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আদর্শের দাবিদার দল ভেবে যতই নিজেরা তুষ্ট হন না কেন, ভুলে গেলে চলবে না—গায়ের জোরে ক্ষমতা দখলের দিন কিন্তু এখন শেষ। আর দেশটা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির হাতে চলে গেলে এর দায়ভার কিন্তু আপনারা কেউই এড়িয়ে যেতে পারবেন না!
লেখক ও কলামিস্ট