খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দেশের প্রায় ৭০০ সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ২৪৬টিতে ৫১৮টি জরুরি চিকিৎসা যন্ত্র দীর্ঘকাল ধরে অচল পড়ে আছে। এর মধ্যে এমআরআই, সিটিস্ক্যান, ক্যাথল্যাব, রেডিওথেরাপি, ডায়ালাইসিস মেশিনের মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও রয়েছে।
ফলে এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (নিমুউ) গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যন্ত্র মেরামতের আবেদনপত্র বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ চিত্রটি উঠে এসেছে।
নিমুউ-এর তথ্য অনুসারে, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৫ হাজার ২৯৮টি চিকিৎসা যন্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে ৫১৮টি অচল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪৯টি উন্নত চিত্রায়ণ ও থেরাপির ভারী যন্ত্র; অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত ১০২টি ওটি লাইট, সেন্ট্রিফিউজ, ইউপিএস, হট এয়ার ওভেনসহ অন্যান্য যন্ত্র; ১৩৫টি অ্যানালাইজার মেশিন, কার্ডিয়াক মনিটর, ভেন্টিলেটর, ডায়ালাইসিস মেশিনসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয় ও লাইফ সাপোর্টে ব্যবহৃত সরঞ্জাম; ৮৫টি অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, ওটি টেবিল, অটোক্লেভসহ সার্জিক্যাল সরঞ্জাম এবং ১৪৭টি মর্চুয়ারি কুলার, ব্লাড ব্যাংক ফ্রিজসহ অন্যান্য যন্ত্র।
নিমুউ-এর প্রধান কারিগরি ব্যবস্থাপক জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় জানান, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৫১৮টি যন্ত্র মেরামতের আবেদন এসেছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আশা করেন, শিগগিরই যন্ত্রগুলো সচল হবে।
নিমুউ-এর কারিগরি ব্যবস্থাপক (মেরামত) প্রকৌশলী মাসুদ হাসান বলেন, ছোট যন্ত্র মেরামতে সাত দিন এবং ভারী যন্ত্রের ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। তিনি আরও জানান, যথাযথ নিয়মে যন্ত্র ব্যবহার না করায় সেগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে এখন যন্ত্র তদারকির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা আগামী ডিসেম্বরে শুরু হবে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে যন্ত্র সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সেবা শাখা ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)। তবে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় চাহিদা ও সক্ষমতা বিবেচনায় না এনেই যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল এবং খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবও একটি বড় সমস্যা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, যন্ত্র কেনার সময়ই রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি করা উচিত। এর অভাবে যন্ত্রগুলো দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি আরও বলেন, যন্ত্র নষ্ট হলে নিমুউ-এর মাধ্যমে মেরামত করতে ছয় মাস লেগে যায়। এই জটিলতা এড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে যন্ত্র মেরামতের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অবহেলা, অদক্ষতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে কোটি কোটি টাকার যন্ত্র অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান জানান, একটি ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, যা কোনো যন্ত্র ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় বন্ধ থাকলেই কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত মেরামতের জন্য অবহিত করবে। এই ব্যবস্থা আগামী ডিসেম্বর থেকে চালু হবে।
রোগী সেবা না পেয়ে ফিরছেন: ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর ঝিনাইদহ থেকে রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার জন্য এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আয়েশা বেগম। চিকিৎসক তাকে রেডিওথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালের আটটি রেডিওথেরাপি যন্ত্রের মধ্যে ছয়টিই অচল থাকায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সিরিয়াল পাননি। তাকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে যোগাযোগের জন্য বলা হয়েছে। হতাশ হয়ে তিনি চিকিৎসা না পেয়েই ঝিনাইদহে ফিরে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যান্সার হাসপাতালে ছয়টি রেডিওথেরাপি যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। এর মধ্যে পাঁচটি মেরামতের অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি একটি যন্ত্র তিন বছরের চুক্তিতে মেরামত করা হলেও ১১ মাস পর তা আবার নষ্ট হয়ে যায়। সিমেন্স বাংলাদেশ নামের প্রতিষ্ঠানটি যন্ত্রটি মেরামতে গড়িমসি করছে। মেরামত করার জন্য হাসপাতাল থেকে চারবার চিঠি পাঠানো হলেও এবং কোম্পানির প্রকৌশলীরা একাধিকবার চেষ্টা করেও যন্ত্রটি সচল করতে পারেননি। বর্তমানে সচল দুটি যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন যেসব রোগীকে রেডিওথেরাপির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তাদের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে আসতে বলা হচ্ছে। ফলে আয়েশার মতো প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী থেরাপি না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। প্রায় এক হাজারের বেশি রোগী এই থেরাপির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছেন। এই হাসপাতালে শুধু রেডিওথেরাপি যন্ত্রই নয়, ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৮টি যন্ত্র অচল। ফলে অনেক রোগী সেবা না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত শনিবার সকালে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের রেডিওথেরাপি ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে শতাধিক রোগী ও তাদের স্বজন লাইনে অপেক্ষা করছেন। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন। কিন্তু দুপুর ১২টার দিকে একজন কর্মী এসে জানান, মেশিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ থেরাপি দেওয়া সম্ভব হবে না। এতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দেয়। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, অচল যন্ত্রগুলো সচল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নতুন রেডিওথেরাপি যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চিত্রও একইরকম। সেখানকার তিনটি রেডিওথেরাপি যন্ত্রের মধ্যে দুটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় ক্যান্সার রোগীদের থেরাপি নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রেডিওথেরাপির মতো জরুরি ১৫টি যন্ত্র ঢামেক হাসপাতালে অচল পড়ে আছে। একজন রোগীর স্বজন জানান, এক্স-রে মেশিন নষ্ট থাকায় তাকে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। আরেক রোগীর স্বজন আবুল কাশেম বলেন, সিটিস্ক্যান অচল থাকায় তিনি এখানে পরীক্ষা করাতে পারেননি। বেসরকারি হাসপাতালে এর খরচ চার-পাঁচ হাজার টাকা, যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে।
চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মীরা জানান, বহু যন্ত্র বছরের পর বছর ধরে অচল পড়ে থাকায় চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রামীণ অঞ্চলের দরিদ্র রোগীরা।
চট্টগ্রামেও একই অবস্থা: চট্টগ্রামের দুটি সরকারি হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এবং ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে মোট ৫০টি চিকিৎসা যন্ত্র অচল পড়ে আছে। চমেকে ২১টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ১০টি, ৫৩টি ইসিজি মেশিনের মধ্যে ২৩টি এবং ৯টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ৫টিই নষ্ট। গত শনিবার চমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ক্যান্সার সন্দেহে এক নারী রোগীকে ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষা করতে বলা হলেও যন্ত্রটি নষ্ট থাকায় তিনি পরীক্ষা না করিয়েই ফিরে যান। ওই রোগী জানান, বেসরকারি হাসপাতালের পরীক্ষার খরচ তার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
এদিকে, জেনারেল হাসপাতালে এক রোগীর স্বজন জানান, তার বাবার মাথায় আঘাত লাগায় চিকিৎসক এমআরআই পরীক্ষা করাতে বলেন, কিন্তু যন্ত্রটি নষ্ট থাকায় তিনি তা করাতে পারেননি। হাসপাতাল সূত্র থেকে জানা যায়, চমেক হাসপাতালের ম্যামোগ্রাফি যন্ত্রটি ২০১৮ সালে চালু হলেও বারবার বিকল হয়েছে। ওয়ারেন্টির তিন বছরের মধ্যে এটি চারবার নষ্ট হয় এবং ২০২২ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে এটি স্থায়ীভাবে অচল রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যন্ত্রটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া না যাওয়ায় এটি মেরামত করা সম্ভব নয় এবং নতুন যন্ত্র কেনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার জানানো হলেও এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন জানান, এমআরআইসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন নষ্ট থাকায় প্রতিদিন অনেক রোগী পরীক্ষা করাতে পারছেন না।
একাধিক হাসপাতালের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক জানান, অচল যন্ত্র মেরামতের জন্য বারবার আবেদন করলেও সময়মতো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একদিকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে কেনা যন্ত্র অকেজো হয়ে পড়ে থাকে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
খবরওয়ালা/টিএসএন