এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
২৬ মার্চ ১৯৭১। অপারেশন সার্চলাইটের বিভীষিকাময় রাতের পরদিনই নওগাঁ মহকুমাকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলার অংশ ঘোষণা করেছিলেন এক সাহসী সেনানায়ক—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর নাম, মেজর নাজমুল হক।
তাঁর জীবন ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে।
১৯৩৮ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আমিরাবাদ গ্রামে জন্ম নেন তিনি। পিতা ছিলেন অ্যাডভোকেট হাফেজ আহমদ, মাতা জয়নাব বেগম। কৃতিত্বের সঙ্গে কুমিল্লার পেশোয়ারা পাঠশালা থেকে ম্যাট্রিক এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ঢাকা আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর কমিশন পান আর্টিলারি কোরে।
মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছেন এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।
১৯৭১ সালে মেজর পদে দায়িত্বে থাকা নাজমুল হক রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুরের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ৭নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান। তরঙ্গপুর ছিল তাঁর হেডকোয়ার্টার। প্রায় পনেরো হাজার মুক্তিকামী মানুষকে তিনি সংগঠিত করেছিলেন, যাদের অধিকাংশই আগে কখনও সামরিক প্রশিক্ষণ পাননি। তাঁর অধীনেই যুদ্ধ করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর।
২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের পরদিন স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে তিনি ঘোষণা দেন—
“নওগাঁ এখন শত্রুমুক্ত, স্বাধীন বাংলার অংশ।”
স্থানীয় যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে গঠন করেন ইপিআর মুজাহিদ বাহিনী। সেই বাহিনী দিয়েই প্রথমে মুক্তি পান নওগাঁ ও বগুড়া, এরপর রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে চালান দ্বিমুখী আক্রমণ। দিনাজপুরের ধনধনিয়াপাড়ার যুদ্ধে ১৪ জন পাক সেনাকে পরাজিত করে মুক্ত করেন এলাকা।
১৯৭১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। ভারতের শিলিগুড়ি ক্যান্টনমেন্টে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় শহিদ হন মেজর নাজমুল হক। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদের প্রাঙ্গণে তাঁর সমাধি শায়িত। তাঁর মৃত্যুর পর মেজর কাজী নুরুজ্জামান ৭নং সেক্টরের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
অপরিসীম সাহস, দৃঢ় নেতৃত্ব আর আত্মত্যাগের জন্য মেজর নাজমুল হক আজও মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে অম্লান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি থেকে গেছেন এক অবহেলিত, অকৃতজ্ঞ জাতির বিস্মৃত সেক্টর কমান্ডার হিসেবে।
আজ তাঁর আত্মত্যাগের দিনে—অগণিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে এই বীর সেনানায়ককেও জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এমএজেড