খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 17শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রঙ্গমঞ্চের কিংবদন্তি, অভিনেতা ও নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর জন্ম ১৮৮৯ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার রামরাজাতলায়।
বঙ্গবাসী স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিএ এবং ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করার পর তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট ও বিদ্যাসাগর কলেজে অধ্যাপনা করেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়।
১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ নাটকে প্রথম মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে তাঁর। এরপর ১৯২১ সালে পেশাদার অভিনেতা হিসেবে যোগ দেন ম্যাডান থিয়েটারে। যদিও মতানৈক্যের কারণে কিছু সময়ের জন্য চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন, যেখানে শরৎচন্দ্রের ‘আঁধারে আলো’ ও ‘চন্দ্রনাথে’ চলচ্চিত্রে তিনি একই সঙ্গে পরিচালক ও অভিনেতার দায়িত্ব পালন করেন।
তবে নাট্যমঞ্চই ছিল তাঁর প্রাণ। ১৯২৩ সালে নিজস্ব নাট্যদল গঠন করে তিনি আবারও থিয়েটারে ফিরলেন। দ্বিজেন্দ্রলালের ‘সীতা’ নাটকে রামচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শক-সমালোচক সবাইকে অভিভূত করেন। নাট্যাচার্য অমৃতলাল বসু তাঁকে ঘোষণা করেছিলেন “থিয়েটারের নবযুগের প্রবর্তক” হিসেবে।
শিশিরকুমার ভাদুড়ী বাংলা নাট্যমঞ্চে অভিনয়শৈলী ও উপস্থাপনায় আনেন মৌলিক রূপান্তর। তিনি কনসার্ট বাদ দিয়ে রোশনচৌকি ব্যবহার করেন, আসনবিন্যাসে বাংলা অক্ষরের প্রয়োগ করেন, প্রবেশপথ সাজাতেন আলপনা ও পূর্ণকলসে। প্রেক্ষাগৃহ ভরে উঠত চন্দন-অগরু ধূপের গন্ধে। পাদপ্রদীপের পরিবর্তে আনলেন আধুনিক আলোকসম্পাত এবং প্রচলিত সিন পরিবর্তনের জায়গায় বক্সসেট ব্যবহারের পথিকৃৎ হলেন।
তাঁর অসামান্য অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য – রঘুপতি ও জয়সিংহ (বিসর্জন), যোগেশ (প্রফুল্ল), জীবানন্দ (ষোড়শী), নাদির শাহ (দিগ্বিজয়ী), নিমচাঁদ (সধবার একাদশী) এবং চন্দ্রবাবু (চিরকুমার সভা)।
১৯৪২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘শ্রীরঙ্গম’ রঙ্গমঞ্চ, যা বর্তমানে ‘বিশ্বরূপা থিয়েটার’ নামে পরিচিত। এই মঞ্চ থেকেই তিনি বহু তরুণকে পেশাদার নাট্যাভিনয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার ১৯৫৯ সালে তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মান দিতে চাইলে তিনি তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—এর চেয়ে জাতীয় নাট্যশালা প্রতিষ্ঠা করা দেশের জন্য বেশি মূল্যবান হবে।
শিশিরকুমার ভাদুড়ী ১৯৫৯ সালের ৩০ জুন চিরনিদ্রায় শায়িত হন। রঙ্গমঞ্চ আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সেই নটরাজকে, যিনি বাংলা থিয়েটারকে আধুনিকতার আলোয় নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
খবরওয়ালা/এমএজেড