খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
সিরিয়ায় গত বছরের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকার পতনের পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সময় রোববার সকালে দেশটির বেশির ভাগ অংশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। কর্মকর্তারা একে যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সব প্রদেশে ভোট হয়নি।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সিরিয়ার সুপ্রিম কমিটি ফর পিপলস অ্যাসেম্বলি ইলেকশন জানিয়েছে—রবিবার সকাল ৯টা থেকে অধিকাংশ প্রদেশে ভোটকেন্দ্র খোলা হয়। অনুমোদিত নির্বাচনী সংস্থার সদস্যরা সরকারি ভোটার কার্ড ব্যবহার করে ভোট দেন।
সিরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রাথমিক ফল রোববার রাতেই ঘোষণা করা হবে এবং চূড়ান্ত ফল সোমবার প্রকাশের কথা। নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র নাওয়ার নাজমেহ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, এ ভোট হচ্ছে নতুন একটি অস্থায়ী আইন কাঠামোর অধীনে। চলতি বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা এক ডিক্রির মাধ্যমে এই কাঠামো চালু করেন। সেই ডিক্রি অনুযায়ী ১০ সদস্যের জাতীয় নির্বাচন কমিটি গঠন করা হয় এবং নতুন নিয়ম কার্যকর হয়।
এ নির্বাচনে সিরিয়ার পার্লামেন্টের ২১০টি আসন পূরণ করা হবে। ব্যবস্থাটি মিশ্র ধরনের—যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ এমপি স্থানীয় সংস্থার মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন এবং এক-তৃতীয়াংশ সরাসরি প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করবেন। আসনগুলো জনসংখ্যা ও সামাজিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়েছে।
তবে রাক্কা ও হাসাকা প্রদেশের বেশির ভাগ এলাকায় ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুয়েইদা প্রদেশের সব আসনও আপাতত খালি থাকবে। তারা জানিয়েছে, ‘যখন উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে, তখন সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
বর্তমানে রাক্কা ও হাসাকা প্রদেশ কুর্দি নেতৃত্বাধীন ওয়াইপিজি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, আর সুয়েইদা রয়েছে দ্রুজ ধর্মীয় নেতা হিকমাত আল হিজরির অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখলে। এই তিনটি অঞ্চলই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
প্রায় ১০ দিনের প্রচার শেষে শুক্রবার নির্বাচনী কার্যক্রম শেষ হয়। এ নির্বাচনে মোট প্রার্থী হয়েছেন ১ হাজার ৫৭৮ জন, যার মধ্যে নারী প্রার্থীর হার ১৪ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আসাদ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ভোটকেন্দ্র স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত খোলা রাখার কথা থাকলেও প্রয়োজনে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময় বাড়ানো যেতে পারে। ভোটগ্রহণ শেষে তিন ঘণ্টা পর থেকে প্রকাশ্যে গণনা শুরু হবে, যা গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হবে।
নতুন কাঠামোয় পার্লামেন্টে নারীদের জন্য ২০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। সংসদের মেয়াদ হবে আড়াই বছর। এই সময়ে সরকার দেশটির প্রথম সরাসরি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেবে।
তবে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত ও দ্রুজ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ভোটের বাইরে থাকা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য কোনো কোটা না থাকায় নতুন পার্লামেন্ট কতটা সিরিয়ার বহুবর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় এ প্রশ্ন আরও গুরুত্ব পেয়েছে। গত কয়েক মাসে আলভি ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সরকারপন্থি বাহিনীর হাতে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
যেভাবে হচ্ছে এই নির্বাচন
সিরিয়ার পার্লামেন্টের মোট ২১০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনের জন্য ভোট হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গঠিত ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে। প্রতিটি জেলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন ভাগ করা হয়েছে। বাকি ৭০ জন সদস্যকে সরাসরি নিয়োগ দেবেন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা।
মোট ৬০টি জেলার প্রায় ৭ হাজার ইলেক্টোরাল কলেজ সদস্য ভোট দিয়ে ১৪০ আসনের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এই সদস্যদেরও নির্বাচন করা হয়েছে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে, যারা সংশ্লিষ্ট জেলায় ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
সব প্রার্থীই ইলেক্টোরাল কলেজ থেকেই আসছেন এবং সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। কারণ, বাশার আল-আসাদের পতনের পর নতুন কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান সব রাজনৈতিক দল ভেঙে দিয়েছে। এখনো নতুন কোনো দল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
খবরওয়ালা/এন