খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র সংকটে পড়েছে। খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, পুঁজির অভাব এবং কিছু ব্যাংকের প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল যে এগুলোকে আলাদাভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার যৌথভাবে একটি বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এই পাঁচটি ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে নতুন একটি ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে, যার নাম হবে ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’। উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দেশের আর্থিক কাঠামোতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
নতুন ব্যাংকটি শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত হবে এবং এটি পরিচালনা করবে অভিজ্ঞ ব্যাংকার, শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পরিচালনা পর্ষদ। পুরনো পাঁচটি ব্যাংকের মালিকদের শেয়ার বাতিল করা হবে, তবে তাদের ঋণ ও দায় নতুন ব্যাংকে স্থানান্তরিত হবে। কারণ, এই ব্যাংকগুলোর নিট সম্পদ বর্তমানে ঋণাত্মক এবং পুরনো শেয়ারের কোনো প্রকৃত মূল্য নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণ প্রায় ১.৯৫ লক্ষ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ১.৪৭ লক্ষ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৭৭ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৮৬ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকে ৪৮ শতাংশ।
এই মার্জারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের নিরাপত্তাকে। যাদের আমানত ২ লাখ টাকার কম, তারা একবারেই পুরো টাকা তুলতে পারবেন। বড় অঙ্কের আমানত ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের নগদ ফেরতের পরিবর্তে নতুন ব্যাংকের শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাব থাকবে।
নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন হবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি সরকার থেকে, ১২ হাজার কোটি আমানত বিমা তহবিল থেকে এবং ৩ হাজার কোটি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসবে। এই অর্থের যোগান বাজেট, বৈদেশিক ঋণ এবং প্রয়োজনে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ড থেকে দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ দেবে না।
তবে মার্জার ঝুঁকি তৈরি করছে। পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত পেইড-আপ ক্যাপিটাল মাত্র ৫,৮১৯ কোটি টাকা, যা ক্ষতি সামলাতে অপ্রতুল। পরিকল্পনা সফল না হলে ব্যাংকিং খাতের জন্য সিস্টেমিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক আমানত বিমা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান আইনে ব্যাংক বন্ধ হলে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হয়, তবে নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সীমা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করার প্রস্তাব আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগ সফল করতে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই প্রধান শর্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “যতক্ষণ না সাধারণ মানুষ নিশ্চিত হয় তাদের অর্থ নিরাপদ, ততক্ষণ নতুন ব্যাংক গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।”
বিশ্বজুড়ে ব্যাংক একীভূতকরণ একটি প্রচলিত কৌশল। ভারত ২০১৭-২০২০ সালের মধ্যে ১০টিরও বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক একীভূত করে সফলতা পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ২০২১ সালে তিনটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে ইন্দোনেশিয়া ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে। পাকিস্তানে একীভূতকরণ কার্যকর হলেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্বল তদারকির কারণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য হয়নি।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকট উত্তরণ সম্ভব, তবে রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্বল নীতিনির্ধারণ থাকলে উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি বহন করে।
খবরওয়ালা/টিএসএন