মো. মাহমুদ হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫
সিন্ডিকেট বা সংঘবদ্ধ উপায়ে অপরাধ সংগঠনের প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত, অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় তাদের মাফিয়া বলা হয়। অর্থবিত্তে সমৃদ্ধ মাফিয়ারা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, ক্রমান্বয়ে প্রক্রিয়াটি মাফিয়াতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও, বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, বিনিয়োগ আর পুঁজিবিহীন অর্থ উপার্জনের প্রক্রিয়াটি জ্যামিতিক গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি শ্রেণি, এই গর্হিত ও অনৈতিক উপায় সমূহকে নৈতিকতা ভাবতে শুরু করেছে!! সমাজটি কি তাহলে মাফিয়াতন্ত্রের দুষ্টু জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে?
আইন-কানুন, সামাজিক রীতিনীতি আর রাষ্ট্রচারকে তোয়াক্কা না করে সমাজ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা নতুন কিছু নয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই প্রক্রিয়াটি বিদ্যমান ছিল। সময়ের পরিবর্তনে এর রূপ, ধরন ও খোলস পালটেছে। নানা রূপে বিকশিত হয়ে সমাজে তা বিষবৃক্ষের রূপ নিয়েছে। যে সমাজ বা রাষ্ট্র মাফিয়া তন্ত্রের জালে আটকা পড়ে যায়, সে সমাজে অস্থিরতা আর দুর্বৃত্তায়ন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থাও কি আজ সেই অন্ধকারেই নিপতিত। মুক্তির উপায় কী? স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরও বাংলাদেশ কেন সেই পথে হাঁটছে? দায় কার?
চব্বিশ বছরের শোষণ থেকে মুক্তির জন্য সংগঠিত হয়েছিল রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ। হাসতে হাসতে আত্মাহুতি দিয়েছিল তরুণ যুবকের দল। লক্ষ্য ছিল মুক্তি। নিজের জীবনের বিসর্জন, উত্তরসূরিদের জন্য নিরাপদ সমাজ তৈরি করবে। এমন ভাবনায় মুক্তিপাগল মানুষগুলো, আত্মবিসর্জনের পথকেই মুক্তির একমাত্র উপায় ভেবেছিল। কেন মেলেনি সেই মুক্তি? রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের কূটচাল-কোনটি দায়ী?
একটি যুদ্ধোত্তর সমাজে অস্থিরতা স্বাভাবিক চিত্র। আর সমাজটি যদি অর্থনৈতিক অবস্থানে পশ্চাৎপদ হয়, সংকটটি তখন আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এই সংকট উত্তরণে দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন দর্শন অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ উত্তর বাংলাদেশে বহুদা বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলো মার্কিন, রুশ, চায়না এমন নানা বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠী, গণমুখী না হয়ে ক্ষমতা বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রতিশোধ পরায়ন পরাজিত শক্তি সুযোগকে কাজে লাগায়। ভুলুঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ। জনতা ভাবতে শুরু করে, আগেই কি ভালো ছিলাম?
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তরুণ সমাজের একটি বৃহত্তম অংশ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ঘর ফেরত মানুষদের পুনর্বাসন যখন জরুরি ছিল, সেই সময়ে তরুণ সমাজ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে নতুন বিপ্লবের পথ খুঁজতে শুরু করে। সহায়তার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংঘাতের সূচনা ঘটে। যা সামাজিক পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলে। বৈষম্যের অবসান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্লোগান হলেও, শাসক বলয় কে ঘিরে গড়ে ওঠে একটি সুবিধাবাদী শ্রেণি। সরকারি, বেসরকারি ও ফেলে যাওয়া সম্পদ গ্রাসে এক নতুন ধনিক শ্রেণি সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় হিমশিম খায় সরকার।
চুয়াত্তরের ভয়াবহ বন্যা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলে। জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দলের প্রতি জনগণের ভালোবাসা বিপরীত দিকে মোড় নেয়। সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় সামরিক নেতৃত্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠে। ছদ্মাবরণে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকলেও, ৯০ এর গণ-অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত সামরিক স্বৈরতন্ত্র অব্যাহত ছিল। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে দীর্ঘদিন পর গণতন্ত্রের বাতাবরণ শুরু হয়।
শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি না হওয়ায় ২০১৪ সালে আবারও গণতন্ত্র হোঁচট খায়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় নির্বাচনের এমন ইতিহাস পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এর ধারাবাহিকতা চলে ২০২৪ সাল অবধি। অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে সরকারি, বেসরকারি মাফিয়াদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলন, সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নিলে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ শুধু সরকার থেকে পদত্যাগ নয়, দলকে বাঁচিয়ে রাখার পথকেও হারিয়ে ফেলে।
বিগত কয়েক দশকে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, রাজধানী থেকে পাড়াগাঁ অবধি একটি শক্তিশালী মাফিয়াতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে। অর্থনীতি থেকে জনপ্রশাসন, রাজনীতি থেকে সামাজিক সম্পর্ক সর্ব ক্ষেত্রে এর বিকাশ ক্রমান্বয়ে দানবীয় রূপ ধারণ করেছে। প্রফেসর ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকে, চিন্তাবিদরা প্রাথমিকভাবে সমাজ পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে ধরে নেয়। পরিবর্তনের প্রতি তরুণদের মুষ্টিবদ্ধ শপথ ও নতুন বন্দোবস্তের আহ্বানে জনগণ ইতিবাচক সাড়া দেয়। বিধি বাম, অল্পদিনেই পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নেয়।
যে তরুণরা বৈষম্যহীন, দুর্নীতি মুক্ত সমাজের কথা বলেছিল, তাঁদের নামে নিয়োগ, পদোন্নতি, কেনাকাটা আর কমিশনে জড়িয়ে যাওয়ার তথ্য জনসমক্ষে আসতে শুরু করলো। কোটি কোটি টাকায় পদায়নের খবর প্রকাশিত হতে শুরু করলো জাতীয় গণমাধ্যমে। ডিসি নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার একটি তদন্ত কমিটি ঘোষণা করলেও রিপোর্ট নিয়ে সরকার গতানুগতিক রাজনৈতিক সরকারের মতোই আচরণ করলো । জনগণ শাস্তির পরিবর্তে আড়াল করার অতীত প্রবণতাকেই দেখতে পেল। উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তো প্রকাশ্যে বললেন, গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে রাজনৈতিক গুষ্টির ভাগবাটোয়ারাটাই মুখ্য ছিল। যা স্পষ্টত প্রমাণ করে, মাফিয়া তন্ত্র শুধু হাত বদল হয়েছে। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মানের পথে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে কোনো নৈতিক ও গুণগত পরিবর্তন প্রতিভাত হয়নি।
১৯৭১ এর অবিসংবাদিত নেতা, মাত্র সাড়ে তিন বছরে জন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। এর জন্য অনেকেই মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেয়া অনেক তরুণদের ঔদ্ধত্যকে দায়ী করেন। ২৪ এর গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী ছাত্র তরুণদের ক্ষমতা অপব্যবহার চিত্রটিও অনেকটা একই রকম। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, অশ্রদ্ধা আর অশ্লীলতার ব্যবহারকে জনগণ ভালো চোখে দেখছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে অশ্লীল শব্দোচ্চারণে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার নামে স্লোগান দেয়া হয়েছে, তা সব সভ্যতা কে হার মানিয়েছে। এ রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি ভাইরাস আকারে সমাজের রন্ধে রন্ধ্রে ছড়িয়ে যাচ্ছে। পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ড. ইউনুস ও দল হিসেবে এনসিপিকে জনগণ কি চোখে দেখছে, আসছে নির্বাচনে হয়ত এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। তারেক রহমান ১০ হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করছেন। মাফিয়াদের আদর্শ নেই। স্বার্থের প্রয়োজনে তাদের মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর লুটপাটের চিত্রে জনগণ তা দেখেছে। ব্যক্তি সারোয়ার আলম দেশ ব্যাপি একটি গ্রহণযোগ্য চরিত্র। সেই দায়বদ্ধতা থেকে তিনি হয়ত যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক মাফিয়ারা জেল বন্দী হয়েছেন এমন কোনো দৃশ্য জনগণ দেখেনি।
এক সময়ে কোন কোন জেলায় রাজনৈতিক মাফিয়াদের গল্প শোনা যেতো। ক্রমান্বয়ে তা সর্বগ্রাসী হয়েছে। পুলিশ ইন্সপেক্টরকে মন্ত্রীর পাশে পায়ের উপর পা উঠিয়ে বসতে দেখেছে জনতা। দম্ভ করে বলতে শুনেছে, জনগণ নয় ওরাই তাদের এমপি, মন্ত্রী বানিয়েছে। ২০১৮ সালে সদ্য নির্বাচিত এক সাংসদ নির্বাচনের পরদিন মাঠের এক পুলিশ কর্তাকে ফুলের তোড়া উপহার দিয়েছিলেন। প্রটোকলের কথা মনে করিয়ে দিলে উত্তরে বললেন, ‘কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়েছিলাম’!! এমন কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক মাফিয়াদের পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক মাফিয়াদেরও জন্ম দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্র।
সর্বগ্রাসী এই সামাজিক মাফিয়াতন্ত্র অবসান বা নিয়ন্ত্রণের উপায় কি? উত্তরটি মোটেও সহজ নয়! দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের পৃষ্ঠপোষকরা যখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে, সুতীব্র সামাজিক আন্দোলন তখন অনিবার্য হয়ে পড়ে। স্বল্প মেয়াদী আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পথ ধরে এসব চ্যালেঞ্জ কে মোকাবেলা করতে হয়। আইনের শাসনের যথাযথ প্রয়োগ স্বল্পকালীন সমাধানের পথকে উন্মুক্ত করলেও, টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
প্রশ্ন জাগে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুষ্টু চক্রে আবদ্ধ হলে দায়িত্বটি কে নেবে? অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে গণতন্ত্রের ধারা উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সমাজের ভালো মানুষের জন্য দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করে, প্রক্রিয়াটি সহজ সাধ্য হওয়ার সুযোগ আছে । আর জনগণ যদি দল, মত, পথের ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ মানুষকে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তাহলে সামাজিক মাফিয়াতন্ত্র অবসানের প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত হতে পারে। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন প্রজন্ম সৃষ্টির মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে হবে। চুড়ান্ত বিচারে সুশাসন ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বটি মূলত: জনগণকেই নিতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
খবরওয়ালা/এমএজেড