খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫
‘মুন্না করবে জয়, বাবু করবে জয়, ওহ্ বুকের গভীরে আমরা জেনেছি, আমরা করব জয় একদিন…।’ ১৯৮৯ সালের মার্চের বিকেলগুলোতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জুড়ে এমন গানেই মুখর ছিল বাতাস। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নারী কর্মীরা গাইতেন এই জনপ্রিয় প্যারোডি গানটি, যার অনুপ্রেরণা ছিল ‘আমরা করব জয়…’—তখনকার রাকসু নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী ছিলেন রাগীব আহসান মুন্না (বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী) এবং জিএস প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস বাবু (ছাত্রলীগ, মু-না)। গানটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে, হয়ে ওঠে ভোটারদের মুখে মুখে।
৩৫ বছর পর আবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। তবে তখনকার নির্বাচন ও আজকের নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য যেন সময়ের ফারাকে মাপা যায়—সেই সময় ছিল না মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টেলিভিশন ক্যামেরা। প্রচারণার মূল ভরসা ছিল মুখে মুখে গান, পোস্টার আর মিছিলের স্লোগান।
১৯৮৯-এর রাকসু: এক প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক উৎসব
তৎকালীন সংবাদপত্র, শিক্ষার্থী ও অংশগ্রহণকারী ছাত্রনেতাদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, ১৯৮৯ সালের ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাকসুর ত্রয়োদশ নির্বাচন—১৯৮০ সালের পর ১০ বছর পর অনুষ্ঠিত এই ভোটকে বলা হয় সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
সে বছর ১৮টি পদের জন্য প্রার্থী ছিলেন ১৭২ জন। মূলত চারটি বড় প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।
মুন্না–বাবু প্যানেল: বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, ছাত্রলীগ (মু-না), ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ঐক্য সমিতি, ছাত্রলীগ (আ-মো) ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন
শাহ আলম–রায়হান প্যানেল: ছাত্রলীগ (সু-র) ও জাতীয় ছাত্রলীগ
রিজভী–মুরাদ প্যানেল: জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল
লতিফ–রফিক প্যানেল: ইসলামী ছাত্রশিবির
প্রতিটি প্যানেলই নিজেদের মতো করে গান, স্লোগান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। যেমন ছাত্রশিবির গাইত‘লতিফ ভাইয়ের ভয়ে রে, রফিক ভাইয়ের ভয়ে রে, জোড়াতালি দিল রে।’
ছাত্রলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগের স্লোগান ছিল—‘শাহ আলম–রায়হান–শরীফুল, রাকসুর তিন ফুল।’
অন্যদিকে মৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল প্রচার করত—‘মুন্না–বাবু–আলমগীর, রাকসুর তিন বীর।’
ছাত্রদলের প্যানেল বলত—‘রিজভী–হারুন–বাহার, রাকসুর সমাহার।’
আর শেষ নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগের স্লোগান ছিল—‘বুদু–শরীফ–হান্নান, রাকসুর তিনটি নাম।’
মাথায় মুকুট ও নবাবি পোশাক পরে রাকসু নির্বাচনের প্রচারণায় এক প্রার্থী। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলা ভবনের সামনে
সংবাদ কাভারেজ ও নিরাপত্তা
তখন নির্বাচনের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেও এতটা জাঁকজমক ছিল না। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনের দিনে দৈনিক সংবাদ প্রথম পাতায় এক কলামে ছেপেছিল—“আজ রাকসু নির্বাচন”, আর ফল প্রকাশের পর ভিপি-জিএসের ছবিসহ একটি ছোট খবর দিয়েছিল। ১৯৯০ সালের নির্বাচনের সময়ও একই রকম ছিল সংবাদ কাভারেজ—কোনো টেলিভিশন প্রতিবেদন বা সরাসরি সম্প্রচার ছিল না।
সেই সময় নির্বাচনের নিরাপত্তায় দায়িত্বে ছিল মাত্র ২৫ প্লাটুন দাঙ্গা পুলিশ।
২০২৫-এর রাকসু: প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণা
এবারের নির্বাচনে রাকসুর ২৩টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৪৭ জন প্রার্থী, ১০টি প্যানেলের হয়ে। ৩৫ বছর আগের তুলনায় ভোটার বেড়েছে ১১,০২৬ জন—আগামী বৃহস্পতিবার ২৮,৯০১ জন শিক্ষার্থী তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এখন প্রচারণার ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রার্থীরা গান গেয়ে, নাটক বা সংলাপ অভিনয় করে ভিডিও তৈরি করছেন; সেগুলো মুঠোফোনে ধারণ করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ফেসবুক ও টিকটকে। ভোট চাইতে খুদে বার্তা পাঠানো হচ্ছে, এমনকি টেলিভিশন সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারের দৃশ্যও আলাদা ক্যামেরায় ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এখন অনেক বড়—২ হাজার পুলিশ ও ১৮ প্লাটুন বিজিবি-র্যাব দায়িত্ব পালন করবেন।
সময়ের ফারাকে রাকসু
তখনকার দিনে প্রচারণা ছিল পোস্টার, মিছিল, গান আর মঞ্চের সাংস্কৃতিক সভায় সীমাবদ্ধ। আজ সেই একই ক্যাম্পাসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও কনটেন্ট, আর অনলাইন প্রচারণা। তবুও মূল চেতনা একই—রাকসু নির্বাচন মানেই ছাত্ররাজনীতির প্রাণ ফিরে পাওয়া, অংশগ্রহণের এক উৎসব।
৩৫ বছর পর রাকসুর মঞ্চে আবারও সেই উচ্ছ্বাস ফিরেছে, যদিও সময়, প্রযুক্তি ও প্রজন্ম বদলে দিয়েছে প্রচারের ধরন।
কিন্তু ইতিহাসের সেই সুর—
“আমরা করব জয় একদিন”—আজও যেন ভেসে আসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাতাসে।
খবরওয়ালা/এমএজেড