অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণার পর কিডনি প্রতিস্থাপনে এক বড় অগ্রগতির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা। এবার এমন সম্ভাবনার সূচনা দেখা দিয়েছে, যেখানে দাতার ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ভিন্ন হলেও কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে। এতে অপেক্ষার সময় কমবে এবং অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।
নেচার বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্সএলার্ট জানিয়েছে, কানাডা ও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একদল গবেষক ‘সর্বজনীন’ কিডনি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই কিডনিটি তাত্ত্বিকভাবে যেকোনো রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।
গবেষণার অংশ হিসেবে এই কিডনি এক ব্রেইন–ডেড রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। রোগীর পরিবারের অনুমতি নিয়ে এটি করা হয়েছিল এবং কিডনিটি কয়েক দিন ধরে কার্যকর অবস্থায় ছিল।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার জৈব রসায়নবিদ স্টিফেন উইদার্স বলেন, মানুষের দেহে এই প্রক্রিয়াটি সফলভাবে কাজ করতে দেখা এটাই প্রথম। এটা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল আরও উন্নত করার বিষয়ে অমূল্য ধারণা দিচ্ছে।
বর্তমানে রক্তের গ্রুপ টাইপ ‘ও’ থাকা মানুষ কেবল টাইপ ‘ও’ দাতার কাছ থেকে কিডনি নিতে পারেন। তবে যেহেতু টাইপ ‘ও’ কিডনি অন্য রক্তের গ্রুপের মানুষেও ব্যবহার করা সম্ভব, তাই এ ধরনের কিডনির চাহিদা বেশি এবং জোগান কম। ফলস্বরূপ, অপেক্ষার তালিকার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ টাইপ ‘ও’ কিডনির জন্য অপেক্ষায় থাকেন।
রক্তের ভিন্ন গ্রুপের কিডনি প্রতিস্থাপন এখন সম্ভব হলেও এটি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। এতে সময় বেশি লাগে এবং ঝুঁকিও অনেক। এছাড়াও, এতে জীবিত দাতার প্রয়োজন হয় কারণ গ্রহীতার শরীরকে আগেই প্রস্তুত করতে হয়। তবে গবেষকরা এবার এমন একটি কৌশল ব্যবহার করেছেন, যেখানে বিশেষ এনজাইমের সাহায্যে টাইপ ‘এ’ কিডনিকে টাইপ ‘ও’ কিডনিতে রূপান্তর করা যায়। এই এনজাইমগুলো টাইপ ‘এ’ রক্তের বিশেষ সুগার অণু বা অ্যান্টিজেন কেটে সরিয়ে দেয়।
গবেষকরা এই এনজাইমগুলোর তুলনা করেছেন ‘আণবিক কাঁচি’র সঙ্গে। উইদার্স বলেন, যেভাবে গাড়ির লাল রং ঘষে তুলে নিলে নিচের নিরপেক্ষ প্রাইমার দেখা যায়, ঠিক সেভাবেই এই প্রক্রিয়ায় কিডনির ওপর থেকে রক্তের গ্রুপের চিহ্ন মুছে দেওয়া যায়। তখন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আর কিডনিটিকে ‘বাইরের অপরিচিত’ অঙ্গ হিসেবে বিচার করে না।
তবে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। জীবিত মানুষের শরীরে পরীক্ষা শুরু করার আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, তৃতীয় দিনে কিডনিতে আবার টাইপ ‘এ’-র কিছু চিহ্ন দেখা দিতে শুরু করে, ফলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তবে এই প্রতিক্রিয়া সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল এবং শরীর কিডনিটিকে সহ্য করার চেষ্টা করছিল বলে গবেষকরা ইঙ্গিত পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন মানুষ কিডনি না পেয়ে মারা যান, এবং অধিকাংশই টাইপ ‘ও’ কিডনির অপেক্ষায় থাকেন। এজন্য বিজ্ঞানীরা বিকল্প পথ খুঁজছেন। শূকরের কিডনি ব্যবহার বা নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি করে এই সংকট কমানোর চেষ্টা চলছে।
উইদার্স বলেন, বছরের পর বছর মৌলিক বিজ্ঞানের কাজ শেষ পর্যন্ত যখন রোগীর চিকিৎসায় কাজে লাগে, তখনই বোঝা যায় আমরা কত দূর এসেছি। আমাদের আবিষ্কার এখন বাস্তবের কাছাকাছি—এটাই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেয়।