খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন ইনস্টিটিউটে (নিটোর) বাঁ হাতে ব্যান্ডেজ মোড়ানো অবস্থায় শুয়ে ছিল ১৫ বছর বয়সী মো. আলী হোসাইন। চিকিৎসকের ভাষ্য, তার বাঁ হাতের কনুই ভেঙে গেছে। গত ৯ অক্টোবর নিটোরে তার অস্ত্রোপচার হয়। ওই সময় পাশে ছিলেন মা গোলাপী বেগম।
গোলাপী বেগমের অভিযোগ, শিক্ষক গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে তার ছেলের হাত ভেঙে দিয়েছেন। এরপর দুই মাস ধরে বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটছেন তারা। প্রথমে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে নেন, পরে চিকিৎসকের পরামর্শে ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিটোরে ভর্তি করান।
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শৈলদাহ গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আলী হোসাইন স্থানীয় চর শৈলদাহ কাসেমুল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। চার ভাইবোনের মধ্যে সে সবার ছোট।
ঘটনার বিষয়ে গোলাপী বেগম জানান, গত ৪ আগস্ট মাদ্রাসায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শিক্ষক শহিদুল মোল্লা তার ছেলেকে কচার লাঠি (এক ধরনের মোটা ডাল) দিয়ে মারধর করেন। এতে আলীর বাঁ হাত ভেঙে যায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে নীতিমালা জারি করে। সেই নীতিমালায় বলা আছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর ওপর এমন শাস্তি দিলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
শিশু আইন ২০১৩–এর ৭০ ধারায় বলা হয়েছে, হেফাজতে বা দায়িত্বে থাকা শিশুকে আঘাত বা নির্যাতন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
গোলাপী বেগম বলেন, ‘ঘটনার পর গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেন। তাদের পরামর্শে কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু এতে অবস্থার আরও অবনতি হয়। পরে স্থানীয় চিকিৎসক হাসপাতালে নিতে বলেন।’
স্থানীয় মুরব্বি মোতাহের মোল্লা বলেন, ‘ছেলেটির বাবা জানিয়েছিলেন, শিক্ষক গাছের ডাল দিয়ে মেরেছেন। তবে কারও কাছে শুনেছি, কয়েক দিন আগেই গাছ থেকে পড়ে তার হাত ভেঙেছিল। বিষয়টি সত্য-মিথ্যা জানি না। আমরা শুধু চাই, সুষ্ঠু সমাধান হোক।’
চর শৈলদাহ কাসেমুল মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসাইন বলেন, ‘ঘটনাটি যতটা বলা হচ্ছে, ততটা গুরুতর নয়। শিশুটির হাত আগেই ভাঙা ছিল। আমাদের মাদ্রাসায় কোনো বেত নেই, শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয় না।’ তবে তিনি জানান, অভিযোগের পর শিক্ষক শহিদুল মোল্লা পলাতক আছেন এবং তাকে আর চাকরিতে বহাল না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আলী হোসাইনের মা অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষায়, ‘নির্যাতনের আগে আমার ছেলে একদম সুস্থ ছিল।’
বাগেরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে শিশুটিকে মারধর করা হয়েছে। এমনকি যদি তার হাত আগে থেকেই ভাঙা থেকেও থাকে এবং তাতে আবার আঘাত লাগে, তাহলেও সেটি অপরাধ। কোনো শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের ওপর হাত তুলতে পারেন না।’
ঘটনার ১৯ দিন পর পরিবার চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮–এ ফোন করে সাহায্য চায়। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহায়তায় আলীকে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আইনি সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮–এর সমন্বয়ক চৌধুরী মোহাম্মদ মোহাইমেন।
এরপর ২৬ আগস্ট চিতলমারী থানায় আলীর বাবা এসকেন্দার খান শিশু আইন ২০১৩–এর ৭০ ধারায় মামলা করেন। অভিযুক্ত দুজন হলেন শিক্ষক শহিদুল মোল্লা (৪৮) ও কর্মচারী আসলাম শেখ (৪৫)।
চিতলমারী থানার ওসি রোকেয়া খানম জানান, ‘আমরা নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। মূল আসামি শিক্ষক শহিদুল মোল্লা পলাতক আছেন। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
অন্য আসামি আসলাম শেখকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন।
অস্ত্রোপচারের পর গত ১৪ অক্টোবর মা–ছেলে বাড়ি ফিরেছেন। তবে সেলাই কাটার জন্য আবার ঢাকায় আসতে হবে। ছেলের চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় গোলাপী বেগম বলেন, ‘হাঁস-বিক্রির কিছু টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম, ছিনতাইয়ে সেটাও হারিয়েছি। এখন মেয়ের জামাতার সহায়তায় চিকিৎসা চলছে।’
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জানান, চিকিৎসার খরচের জন্য শিশুটির বাবাকে দুই দফায় সাত হাজার এবং সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।