খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক সংকটে। টানা প্রায় চার বছর ধরে শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না, ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম চাপে পড়েছে। অনেকেই এখন সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন, কেউ কেউ কমিয়ে দিচ্ছেন মৌলিক চাহিদার ব্যয়—খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গড় মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ দশমিক ০২ শতাংশ, কিন্তু একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত আয়ের ঘাটতি বেড়েই চলছে। জুলাইয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৯ শতাংশ, আগস্টে ৮.১৫ শতাংশ—আর সেপ্টেম্বরের শেষে এসে তা আরও নেমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি এক ধরনের “নীরব শ্রমবাজার সংকট”। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “শ্রমিকরা এখন দুই দিক থেকে আঘাত পাচ্ছেন—একদিকে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, অন্যদিকে মজুরি বাড়ছে কম। এটি যেন মাথা ও পায়ে একসঙ্গে আঘাতের মতো।” তিনি মনে করেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ছাড়া বাস্তব আয় পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, “মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি অর্থনীতির গভীর দুর্বলতা নির্দেশ করছে। বিনিয়োগ কমেছে, নতুন নিয়োগ থেমে গেছে—ফলে শ্রমবাজারে চাহিদা কমছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।”
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—যা আগের মাসের চেয়ে বেশি। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, সবজি, ওষুধ ও বাসাভাড়ার দাম বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। অন্যদিকে মজুরি সেই হারে না বাড়ায় সাধারণ মানুষের বাস্তব আয় কমছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে ঋণ বা ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ভোক্তা ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাহিদা সংকোচনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্যমতে, দেশে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বেড়ে ২ কোটি ৩৬ লাখে দাঁড়িয়েছে—এক বছরে প্রায় ৭০ লাখ বৃদ্ধি। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও শিক্ষা খাতে ব্যয় লাগাতার বাড়ছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “আগে মাসে যে টাকায় সংসার চলত, এখন লাগে প্রায় দেড়গুণ।”
বিবিএসের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে—গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আইএমএফও ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়ে ৫.৪ থেকে ৪.৯ শতাংশে নামিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৩৫ শতাংশ—২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদহার, ব্যাংক ঋণ সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রকল্প প্রায় বন্ধ। ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “উচ্চ সুদ ও অস্থিরতা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। নির্বাচনের পর স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগে গতি আসবে।”
২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) নতুন বিদেশি বিনিয়োগ ৬২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারে, যেখানে আগের বছর ছিল ২১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ইতিবাচক দিক হলো—বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ চারগুণ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ তৌফিক আহমেদ চৌধুরীর মতে, “বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন না, বরং টিকে থাকার কৌশল নিচ্ছেন—এটি ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত।”
বিবিএসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, দেশে বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ—প্রায় ২৭ লাখ মানুষ বেকার। তরুণদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। আইএলও জানাচ্ছে, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান প্রায় থেমে গেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ সঞ্চয়পত্র কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে সঞ্চয়পত্র বিক্রি নেমে এসেছে মাত্র ২৮৯ কোটি টাকায়—এক বছরে ৮৮ শতাংশ কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, “মানুষের হাতে অতিরিক্ত টাকা নেই, অনেকে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। এতে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক খাত উভয়ই চাপের মুখে পড়ছে।”
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশের রফতানি টানা দুই মাস কমেছে—আগস্টে ৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে আরও ৪.৬১ শতাংশ। তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, পাটজাত পণ্য ও হোম টেক্সটাইলের রফতানি সবচেয়ে বেশি কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অতিদারিদ্র্যের মধ্যে নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ যুক্ত হতে পারে। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। পিপিআরসি’র হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি মানুষ এখন বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে বাস করছে।
সিপিডির অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “চার বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করেছে। সুশাসন ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।”
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতি এখন “চাপের বলয়ে”—রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, আমদানি ব্যয় ও রাজস্ব ঘাটতির কারণে উৎপাদন ও বিনিয়োগ উভয়ই স্থবির। এ অবস্থা কাটাতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—
মজুরি বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ চেইন শক্তিশালীকরণ,নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা ও নগদ ভর্তুকি বৃদ্ধি, এবং বিনিয়োগবান্ধব রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
অধ্যাপক লুৎফর রহমানের মতে, “নির্বাচনের পর স্থিতিশীল সরকার গঠিত হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আসবে, তাতে ধীরে ধীরে মজুরিও বাড়বে। তবে এর আগে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য ওএমএস ও রেশনিং কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি, যাতে তারা অন্তত নিত্যপ্রয়োজনে স্বস্তি পান।”