খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫
দেশের রপ্তানি আয়ের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়ে দেশের বৈদেশিক খাতে নতুন করে চাপ তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে টাকার মান কমে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও হ্রাস পেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ থেকে মোট ১,১০৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১,৬৮০ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৭১ কোটি ২০ লাখ ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪৬৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনীতি এখনো আমদানিনির্ভর। শিল্প উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি। অপরদিকে, বৈশ্বিক মন্দা ও প্রতিযোগিতার কারণে রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে, যা ঘাটতি আরও বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। রপ্তানি খাতকে বহুমুখীকরণ করতে হবে। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি আইটি, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল খাতে রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। এছাড়া প্রবাসী আয় বাড়াতে ব্যাংকিং চ্যানেলকে আরও আকর্ষণীয় করা, বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করতেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ—এই দুই দিকেই সুষম পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে এবং দেশের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীলতা ফিরে পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থাকলেও চলতি অর্থবছরে তা চার কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঘাটতিতে নেমে এসেছে। তবে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালান্স) ঘাটতি থেকে উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে। গত বছর জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এই সূচকে ঘাটতি ছিল ১৪৮ কোটি ডলার, আর চলতি অর্থবছরে তা ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত।
তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৭.৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫.৯ শতাংশ বেশি। আগের বছরের একই সময়ে মোট রেমিট্যান্স ছিল ৬.৫৪ বিলিয়ন ডলার।
দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তিন মাসে ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের এফডিআই এলেও চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট) এখনো নেতিবাচক অবস্থায় আছে। প্রথম তিন মাসে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ যা এসেছিল, তার চেয়ে বেশি অর্থ চলে গেছে। আগের অর্থবছরে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৫০ লাখ ডলার, আর এবার তা ঋণাত্মক চার কোটি ২০ লাখ ডলার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, “বর্তমানে দেশের ভোগ্যপণ্য আমদানি বেড়েছে। কারণ ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয়ার্ধে রমজান মাস শুরু হতে যাচ্ছে। রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এজন্য বিপুল পরিমাণ এলসি খোলা হয়েছে। ফলে রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বেশি, যা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ও ট্রেড ব্যালান্স—দুটিতেই ঘাটতি বাড়িয়েছে।”
খবরওয়ালা/টিএসএন