খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম জানাই একাত্তরের অগ্নিকন্যা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নীপা লাহিড়ীকে। দেশ স্বাধীন হয়েছে অর্ধ শতাব্দিরও বেশি সময় আগে। বহু সরকার এসেছে, নানা আয়োজন হয়েছে, ইতিহাস রচিত হয়েছে। তবু রাষ্ট্রীয় খেতাব এখনো তাঁর নামের কাছে পৌঁছায়নি। তবে জনগণ ভুলে যায়নি। সাধারণ মানুষ, ইতিহাসপ্রেমী হৃদয় এবং ফেসবুক পরিবার মিলে তাঁকে খেতাব দিয়েছি, শ্রদ্ধার সীলমোহর দিয়েছি—নীপা হয়ে উঠেছেন একাত্তরের প্রীতিলতা।
‘৭১—আগুনের মাঝেও অদম্য সাহস
গ্রামজুড়ে আগুন জ্বলছে। চালের উপর আগুন নেমে এসেছে, চারপাশে ধোঁয়ার কালো অন্ধকার। কামানের বিকট গর্জন শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। কান পাতা দায়, নিশ্বাস নেওয়া দায়—তবু নীপা পিছিয়ে যাননি।
অস্ত্র উদ্ধারের জন্য জীবনকে বাজি রেখে তিনি আবার জ্বলন্ত ঘরে ঢুকলেন। অস্ত্র ও গ্রেনেড সব সংগ্রহ করে দৌড়ে বের হচ্ছিলেন। ঘরের দেয়াল-বেড়া আগুনে ছুঁয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে আগুনের ঝলক তাঁর দৃঢ় মুখাবয়ব স্পষ্ট করছে। ঘরের চাল ধসে পড়ছে, মৃত্যু ক্রমশ ঘিরে আসছে।
তবুও তিনি থামলেন না। অস্ত্রভর্তি ব্যাগ নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। কখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ তাঁর দেহে লেগেছে, তা তিনি টের পাননি। স্বাধীনতার সেই তরুণী আগুনে দগ্ধ হয়ে ইতিহাসের গহীনে বিলীন হয়ে গেলেন। তাঁর আত্মদান মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য আলোকিত করে রেখেছে।
নীপা—এক নিবেদিতপ্রাণ বিদোষী পরিবারের সন্তান
১৯৭১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নীপা লাহিড়ী শুধু একজন ছাত্রীই ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন সৈনিক, সংগ্রামী এবং অগ্নিপরীক্ষিত এক নারী।
তাঁর পরিবার শিক্ষায় ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ।
পিতা: অধ্যক্ষ শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী—বাংলা ভাষার অভিধান প্রণেতা।
মাতা: অধ্যাপিকা রমা লাহিড়ী—বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্ব গবেষক।
বোন: ডা. নীরা লাহিড়ী—বাংলাদেশের প্রথম নারী রেডিওলজিস্ট।
এমন মেধাবী পরিবারে জন্ম নেওয়া নীপা ছোটবেলা থেকেই মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং সাহসিকতার বাতাসে বেড়ে উঠেছিলেন।
জন্ম ও শহীদ হওয়া
জন্ম: ১৭ মে ১৯৫৩
আদি নিবাস: পাবনা
শহীদ: ২২ নভেম্বর ১৯৭১, কালীগঞ্জ সীমান্তে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে
তাঁর অবদান ও আত্মত্যাগ ইতিহাসে এখনও পুরোপুরি লেখা হয়নি। সরকারি উপেক্ষার মধ্যেও লোকমুখের গল্পে এবং সীমান্তের নীরব বাতাসে তা অম্লান।
আমাদের শ্রদ্ধা
শহীদ নীপা লাহিড়ী, তুমি প্রমাণ করেছ—দেশপ্রেম বয়স, লিঙ্গ বা পরিচয় দেখে না; শুধু অটল প্রত্যয় এবং আত্মদান দেখে। রাষ্ট্র হয়তো ভুলে গেছে, কিন্তু জাতি ভুলে যায়নি।
আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গর্ব চিরকাল তোমার সঙ্গেই থাকবে। অমর শহীদ নীপা লাহিড়ীকে জানাই গভীরতম শ্রদ্ধাঞ্জলি। যতদিন বাংলাদেশ নামে দেশ থাকবে, ততদিন তুমি বেঁচে থাকবে—বীরত্বের দীপ্ততম আলো হয়ে।
খবরওয়ালা/টিএসএন