এস এম কামরুজ্জামান সাগর
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
জামায়াতের সমাবেশের মঞ্চ ও সিঁড়ি সজ্জার ছবি সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মঞ্চের সিঁড়িগুলো সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার আদলে লাল ও সবুজ রঙে রাঙানো হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ঔদ্ধত্যপূর্ণ পদক্ষেপ। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন এবং সিঁড়িতে হেঁটেছেন একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধী দল জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই লাল-সবুজ পতাকাকে এভাবে পদদলিত করার দৃশ্য দেশের আপামর সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার জন্ম দিয়েছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের স্রোতে হাত রঞ্জিত করেছিল, লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠনে সহযোগিতা করেছিল এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, সেই যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার-জামায়াত গোষ্ঠীর এমন আচরণ যেন তাদের পুরনো ধৃষ্টতারই নতুন বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ যেন দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এভাবে জাতীয় পতাকার আদলে মঞ্চ বানিয়ে পদদলিত করা, যা রীতিমতো পতাকা অবমাননা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করার শামিল।
জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। যেখানে পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের এই লাল-সবুজ পতাকা আমাদের আত্মত্যাগ ও অস্তিত্বের প্রতীক, সেখানে এটিকে এভাবে মঞ্চের সজ্জায় ব্যবহার করে এর উপর দিয়ে হাঁটা, দাঁড়িয়ে থাকা – এটি শুধু একটি সজ্জার ত্রুটি নয়, এটি আমাদের সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এবং স্বাধীনতার চেতনার প্রতি সরাসরি অপমান।
পতাকা অবমাননার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের পাশাপাশি, প্রশ্ন তোলা জরুরি যে এই ধৃষ্টতার পথ প্রশস্ত হলো কীভাবে? দেশের সাধারণ মানুষ আজ যখন এই অবমাননা দেখে বুক চাপড়াচ্ছেন, তখন তাদের মনে পড়ে যাচ্ছে গত বছর জুলাই মাসের দাঙ্গার কথা।
সে সময় লাল বদর বাহিনীরা দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার সুযোগ করে দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, যারা এই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল, তাদেরই আজ এই অপমানের প্রধান দায় নিতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের হাতে ক্ষমতার চাবি তুলে দিয়ে, তাদের পাপের ভাগীদার হয়ে লাল বদর শ্রেণির মানুষই এই অবমাননার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছেন। এই ঘটনায় যেন সেই সমালোচনাই আরও একবার প্রমাণিত হলো। গত জুলাইয়ে যে অপমানের বীজ বপন করা হয়েছিল, আজকের এই পতাকা অবমাননা তারই ফলশ্রুতি।
আমরা পতাকা অবমাননার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। একইসঙ্গে সকলের প্রতি আহ্বান জানাই, যেন জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষার এই পবিত্র দায়িত্বকে কেউ ভুলতে না পারে। যে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা এই লাল-সবুজ পতাকা অর্জন করেছি, সেই পতাকার সম্মান রক্ষায় দেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষা একটি নিরন্তর সংগ্রাম। এই সংগ্রামকে কখনও দুর্বল হতে দেওয়া যাবে না।
লেখকঃ নির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।