খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
উপমহাদেশের ইতিহাসে দানশীলতার প্রতীক হিসেবে যাঁর নাম সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয়, তিনি হাজী মুহাম্মদ মহসিন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানবকল্যাণে নিবেদিত অসামান্য জীবন তাঁকে পরিণত করেছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দানবীরের প্রতীকী ব্যক্তিত্বে।
১৭৩২ সালের ৩ জানুয়ারি হুগলিতে জন্ম নেওয়া মহসিনের পরিবার ছিল সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী। পিতা হাজী ফয়জুল্লাহ ছিলেন ধনী জায়গিরদার এবং মা জয়নব খানমের হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় বিস্তীর্ণ সম্পত্তি ছিল। পরে বোন মন্নুজানের মৃত্যুর পর বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন তিনি।
অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মহসিন ছিলেন ব্যতিক্রম। জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের পরিবর্তে ইমামবাড়ার পাশের ছোট কুটিরে সাধারণ মানুষের মতোই বসবাস করতেন। কুরআন শরীফ হাতে নকল করে জীবনযাপন করতেন এবং নিজ হাতে রান্না করে অধীনস্থদের সঙ্গে বসেই আহার করতেন।
ধর্ম, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাঁর আগ্রহ ছিল শৈশব থেকেই। প্রাথমিক শিক্ষার পর উচ্চশিক্ষার জন্য মুর্শিদাবাদে যান। পরে জ্ঞানার্জন ও সাধনার উদ্দেশ্যে মক্কা-মদিনা, কারবালা, কুফা, ইরান, ইরাক, আরব ও তুরস্কসহ নানা দেশে প্রায় ২৭ বছর ভ্রমণ করেন।
দেশে ফিরে মানবকল্যাণেই নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেন। ১৭৬৯–৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে তিনি অসংখ্য লঙ্গরখানা স্থাপন করে দুস্থ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেন। সরকারি তহবিলেও প্রদান করেন বিপুল অর্থসাহায্য। তাঁর দান ও মানবিক সেবায় গড়ে ওঠে হুগলি মহসিন কলেজ, চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, দৌলতপুর মহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বহু প্রতিষ্ঠান।
১৮০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সুপ্রসিদ্ধ ‘মহসিন ফান্ড’, যার আয় ব্যয় করা হতো ধর্মীয় কার্যক্রম, পেনশন, বৃত্তি ও দরিদ্র মানুষের সহায়তায়। আজও হাজারো মানুষ এই ফান্ড থেকে উপকৃত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি বিএনএস হাজী মহসিনসহ বহু স্থাপনা আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে।
১৮১২ সালের ২৯ নভেম্বর হুগলিতে মৃত্যুবরণ করেন এই মহতী দানবীর। তাঁকে সমাহিত করা হয় হুগলির ইমামবাড়ার পাশে।
মানবতা, উদারতা এবং নিঃস্বার্থ দানের মহিমায় হাজী মুহাম্মদ মহসিন আজও বাঙালির হৃদয়ে চিরসমুজ্জ্বল।
খবরওয়ালা/টিএসএন