খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ৩০ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা সাহিত্যজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সমালোচক ও সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু আধুনিক কবিতা ও সাহিত্যচিন্তায় রেখে গেছেন অনন্য ও অসামান্য অবদান।
১৯০৮ সালের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লায় তাঁর জন্ম। পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুর পরগনার মালখানগর। জন্মের কিছুদিন পরই ধনুষ্টংকারে মাকে হারান। পরবর্তীতে বাবা পরিব্রজ্যা গ্রহণ করে নিরুদ্দেশ হলে তাঁর লালন-পালন হয় মাতুলালয়ে। শৈশব–কৈশোর কেটেছে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ঢাকার পরিবেশে, যা তাঁর সৃজনশীলতা, অনুভব ও বোধকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯২৫ সালে ম্যাট্রিক, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯২৭ সালে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩০ সালে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ ও ১৯৩১ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন—সব ক্ষেত্রেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে।
কর্মজীবন শুরু হয় কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে। পরে ১৯৪৪ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাংবাদিকতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও প্রশস্ত করে। পরবর্তী সময়ে তিনি আমেরিকার পেনসিলভানিয়া কলেজ ফর উইমেন্স, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রুকলিন কলেজ, কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামার স্কুলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার সুযোগ পান। ১৯৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎ বক্তৃতামালা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কৃতিত্বের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
সম্পাদক হিসেবেও তাঁর অবদান অনন্য। ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রগতি এবং কলকাতা থেকে ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত প্রকাশিত কবিতা পত্রিকা বাংলা কবিতার নবযুগ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কবিতা পত্রিকা রবীন্দ্রোত্তর কবিতা আন্দোলনে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। বুদ্ধদেব নিজেও ধীরে ধীরে রবীন্দ্র প্রভাব অতিক্রম করে আধুনিকতার নিজস্ব ধারায় উত্তরণ ঘটান।
কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সমালোচনা—বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। প্রথমদিকে রোমান্টিকতার ছাপ থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখায় মননশীলতা প্রধান হয়ে ওঠে। তাঁর গদ্যে ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর ও চিন্তার সূক্ষ্মতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা বুদ্ধদেব বসু শিশুদের জন্যও লিখেছেন। ইংরেজিতে রচিত তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ ইউরোপ ও আমেরিকায়ও প্রশংসা পেয়েছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
– ১৯৬৭: তপস্বী ও তরঙ্গিণী নাটকের জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার
– ১৯৭০: ভারত সরকারের পদ্মভূষণ
– ১৯৭৪: স্বাগত বিদায় কাব্যগ্রন্থের জন্য মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার
ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুসাহিত্যিক প্রতিভা বসুর সঙ্গে, যিনি তাঁর সাহিত্যজীবনের ঘনিষ্ঠ সহচরী ছিলেন।
১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। যদিও তিনি চলে গেছেন বহু বছর আগে, বাংলা সাহিত্যে রেখে যাওয়া তাঁর আলোকরেখা আজও সমান উজ্জ্বল।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
খবরওয়ালা/এসএস