খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 17শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ১ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
১৯৭১—রক্তাক্ত সেই বছর। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সী এক কিশোরীর স্বপ্ন ছিল একদিন শান্তি ও সুখের ছোট্ট ঘর তৈরি করা। গোলাভরা ধান, নিঃশব্দ জীবনের ক্ষুদ্র আনন্দ—এসব তার ভাবনায় ভরা। কিন্তু ইতিহাস তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে এক ভিন্ন পথে, যেখানে সাহস, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের গল্প লেখা হয়েছে।
কমান্ডারের নির্দেশে তার বুকে শুধু একটি কলাগাছ জড়িয়ে রাখতেন। সেই কলাগাছই ছিল তার সাহসের ঢাল। রাতের অন্ধকারে খরস্রোতা নদী পেরিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে পৌঁছাতেন তিনি—গুপ্তচরের ভূমিকায়। শত্রুর অদূরে থাকা সত্ত্বেও ভয় তার চোখে ছিল না, শুধু মুক্তির অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
নিজেকে আড়াল করতে কাদা, নোংরা এবং এমনকি পায়খানা মেখে ঘুরতেন। চুল, গায়ে ও পোশাকে দুর্গন্ধ মিশিয়ে ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরে বেড়াতেন। সবাই ভাবত তিনি এক পাগলিনী। কিন্তু সেই ধারণাই তার শক্তি। সেই ‘পাগলিনী’ আড়াল থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর সমস্ত গোপন খবর সংগ্রহ করতেন—অস্ত্রের সংখ্যা, হামলার পরিকল্পনা, কোন ঘরে মেয়েরা বন্দি এবং নির্যাতিত হচ্ছে—প্রতিটি তথ্য জীবন বাঁচানোর চাবিকাঠি।
শৈশবের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, মা-মেয়েকে ভিক্ষুক বানানো হয়েছিল, কচুরমাথা সেদ্ধ খেয়ে দিন কাটত—তবুও তারামন বিবি হয়ে উঠলেন মুক্তিযোদ্ধাদের অমূল্য সহযোদ্ধা। শরণার্থী অবস্থায় রান্নার কাজ পেয়ে গেরিলা ক্যাম্পে কাজ শুরু করেন। কমান্ডার আজিজ মাস্টার তাঁকে “ধর্ম মেয়ে” বানিয়ে দেশের মেয়েদের প্রতি অসম্মান প্রতিহত করতে পাশে থাকার আহ্বান জানান।
হাঁড়ি-পাতিল ধোয়ার সময় হাত ধরে নেন ভারী অস্ত্র। চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য এখনও মনে পড়ে—
গোলাগুলির মধ্যে চৌদ্দ বছরের কিশোরী ভাত রেঁধে চলেছে;
পরের মুহূর্তে গাছে চড়ে শত্রুর অস্ত্র গুনছে;
আরেক মুহূর্তে পাকিস্তানি ক্যাম্পে খবর সংগ্রহ করছে;
অবশেষে দেশের জন্য হাতে নিল স্টেনগান।
ছোট দেহে অদ্ভুত দৃঢ়তা, বুকভরা সাহস।
নোংরা ডোবা পেরিয়ে দিনের পর দিন রেকি করে।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অস্ত্রধারী বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্যবস্তুতে তাকিয়ে আছে তার হাতে ধরা বন্দুক।
এই হাতেই গুলি লেগেছে। এই হাতেই ঝরেছে রক্ত।
তবুও থেমে থাকেননি। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম ও দুঃসাহস অব্যাহত ছিল।
আমরা কি তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে পেরেছি?
তারামন বিবি—যার অস্তিত্বই ছিল ত্যাগের ভাষা। মাটি, মা এবং মাতৃভূমির প্রতি নিবেদিত এক অসীম প্রেমের প্রতীক।
২০১৮ সালের বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের বুকেই চিরশায়িত হলেন বীরপ্রতীক তারামন বিবি।
জন্ম ১৯৫৭ সালে, কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে। কিন্তু প্রকৃত জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের গর্জনের মধ্যে—ন্যায়ের বিরুদ্ধে, মুক্তির জন্য।
সালাম ও গভীর শ্রদ্ধা, বীরপ্রতীক তারামন বিবি।
আপনি আমাদের ইতিহাসের সাহস, সংকল্প ও ত্যাগের চিরন্তন দীপশিখা।
খবরওয়ালা /এজে