খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নয়াদিল্লি আগমন শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়—এটি বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিতে ভারতের অবস্থানকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এটাই পুতিনের প্রথম ভারত সফর।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে সামরিক সম্মান ও উচ্চপ্রটোকলের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানান। আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে দু’নেতার গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠক, যেখানে প্রতিরক্ষা চুক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে।
ভারতের কূটনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত সংবেদনশীল।
রাশিয়া ভারতের প্রধান সামরিক সরবরাহকারী; বর্তমানে ভারতের অধিকাংশ যুদ্ধবিমানই রাশিয়ার সুখোই এসইউ-৩০। এবার আলোচনায় আছে উন্নত এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান। আবার সাশ্রয়ী রাশিয়ান তেল ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি।
কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য অপরিহার্য—প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, বিনিয়োগ এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের কারণে। অথচ রাশিয়ার তেল কেনার জেরে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর ৫০% শুল্ক আরোপ করেছে, যা নয়াদিল্লির জন্য বিশাল চাপ।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে একটি ১০ বছর মেয়াদি শিল্প ও প্রযুক্তি কাঠামো নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গেও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়াদিল্লির পক্ষে অসম্ভব।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই ভারতকে বাধ্য করছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে।
চীন–ভারতের সীমান্ত উত্তেজনা এবং পাকিস্তানের কাছে চীনা সামরিক সহায়তা ভারতের জন্য বড় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ। রাশিয়া–চীন ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও মস্কো এখনও ভারতের নির্ভরযোগ্য সামরিক অংশীদার।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও রাশিয়া–সম্পৃক্ত নিষেধাজ্ঞা ভারতের আমদানি–নীতি চাপে ফেলেছে। তেল আমদানি কমে ডিসেম্বরেই তিন বছরের সর্বনিম্নে নামতে পারে।
বিদেশনীতি–বিশ্লেষকেরা বলছেন, পুতিনকে আড়ম্বরপূর্ণ অভ্যর্থনা দিয়ে ভারত মূলত বিশ্বকে দেখাচ্ছে—‘নয়াদিল্লির বিকল্প আছে’। এই অবস্থান ভারতে কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ায়।
তবে ওয়াশিংটন ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে পুতিন সফরের ওপর, বিশেষত সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর কারণে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ভারতকে চীনের পাল্টা শক্তি হিসেবে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পেতে।
ভারতের বাস্তবতা হলো—তাদের একদিকে রাশিয়া প্রয়োজন নিরাপত্তার জন্য, আর যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন উচ্চপ্রযুক্তি, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য।
ফলে, দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে ভারতকে যে সূক্ষ্ম, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অত্যন্ত কৌশলগত পথ হাঁটতে হচ্ছে, পুতিনের এই সফর তা আরও স্পষ্ট করে দিল।