খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই ডিসেম্বর ২০২৫, ৮:৪৯ এএম
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি রেমিটেন্স। বিদেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকরা প্রতি বছর যেসব অর্থ দেশে পাঠান, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, বাণিজ্য ভারসাম্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম মূলভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। প্রবাসী শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, নীতিনির্ধারণে দুর্বলতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা এবং বিদেশি লবিস্টদের প্রভাব—সব মিলিয়ে শ্রমবাজার কার্যত ধসে পড়ার উপক্রম। এর ফলে লাখো শ্রমিকের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি দেশের রেমিটেন্স প্রবাহও ঝুঁকির মুখে।
গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপসহ নানা দেশ বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে। এর ফলে বাজারের ওপর চাপ পড়েছে মাত্র কয়েকটি দেশের—সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ওমান। গত বছর ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশ গেলেও এর ৯৫ শতাংশই গেছে মাত্র পাঁচ দেশে। নতুন বাজার সৃষ্টি না হলে এই নির্ভরতা দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত তো ২০২৬ সাল থেকে বাংলাদেশসহ ৯ দেশের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যাচ্ছে—যা শ্রমবাজার সংকোচনের আরেকটি বড় আঘাত।
অভিযুক্ত সিন্ডিকেট কাঠামোই বিদেশি শ্রমবাজার সংকোচনের সবচেয়ে বড় কারণ। মাত্র কয়েকটি প্রভাবশালী এজেন্সি ও বিদেশি লবিস্ট মিলে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে হাজারো লাইসেন্সধারী বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি অসহায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা এখন জরুরি প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বহু বছর ধরে সিন্ডিকেট-দ্বন্দ্বে স্থবির। একই পরিস্থিতি অন্য দেশগুলোতেও দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারের নীতিগত ভুলের কারণে বোয়েসেলকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়াই শ্রমবাজার সংকোচনের অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে বিদেশে কর্মী পাঠানো পূর্বের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
এদিকে গত এক বছরে ৬ লাখ ৭১ হাজার কর্মী সৌদি আরবে পাঠানো সম্ভব হলেও প্রায় ২০০ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নবায়ন আটকে থাকার কারণে হাজারো ভিসাপ্রাপ্ত কর্মী দেশ ছাড়তে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পথে, ফলে ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলো আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েছে।
দক্ষতার সংকটও শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার বড় কারণ। ইপিএসের আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশকে বছরে ১০,৩০০ কর্মীর কোটা দিলেও পাঠানো গেছে মাত্র ১,৫০০ জন।
অন্যদিকে নেপাল, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া প্রায় ৯০–১০০% কোটা পূরণ করছে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
নারী কর্মী প্রবাসে যাওয়া ২০১৬ সালের তুলনায় কমেছে ৬৬ শতাংশ—এটিও সংকটের গভীর ইঙ্গিত।
ওয়ান–স্টপ সার্ভিস বন্ধ হওয়ায় বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সুযোগ বুঝে বাড়তি সার্ভিস চার্জ আদায় করছে। বহির্গমন ছাড়পত্র কঠোর হওয়ায় সৌদিগামী কর্মী পাঠানো কমছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোর অদক্ষতাও এই সংকটের বড় কারণ। পাসপোর্ট নবায়ন থেকে শুরু করে যাচাইকরণ—সব সেবাতেই হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন—
“বাংলাদেশ এখন বড় ঝুঁকিতে। বাজার মাত্র ১০-১১টি দেশে সীমাবদ্ধ। এর একটিতেও সমস্যা হলে কর্মী পাঠানো অর্ধেকে নেমে আসবে।”
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনিরের মতে—
“দালাল-সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে অভিবাসন ব্যয় কখনোই কমবে না। বাজারও সংকুচিতই হবে।”
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন—
“সিন্ডিকেট থাকলে শ্রমবাজারে বড় ধস অনিবার্য।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট উত্তরণে চারটি বড় পদক্ষেপ জরুরি—
সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা
দক্ষতা উন্নয়ন জোরদার করা
নতুন শ্রমবাজার তৈরি
প্রশাসনিক সংস্কার ও আমলাতন্ত্র কমানো
এগুলো না হলে রেমিটেন্স প্রবাহ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা লাগবে—যার প্রভাব পড়বে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে।
মন্তব্য