খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫
রংপুর–দিনাজপুর মহাসড়কে ঘটে যাওয়া এক সড়ক দুর্ঘটনা এক সাধারণ পরিশ্রমী মানুষের জীবন নিভিয়ে দিয়েছে। আর সেই সঙ্গে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে তাঁর ওপর নির্ভরশীল সাত সদস্যের পরিবার। পরিবারটি এখন শোক, হতাশা ও অনিশ্চয়তার প্রহর গুণছে।
গোলাম মোস্তফা—একজন ইজিবাইক চালক, পেশায় সাধারণ হলেও পরিবারে ছিলেন একমাত্র অবলম্বন। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে যা উপার্জন করতেন, তা দিয়েই চলত পরিবারের খাবার, বাবার ওষুধ, মা ও স্ত্রী–সন্তানের চাহিদা। কিন্তু শনিবার বিকেলের একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই এই সংসারের সব হিসাব ওলট–পালট করে দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ব্রাদার্স হিমাগারের সামনে। পুলিশ জানায়—মোস্তফা ইজিবাইক নিয়ে সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঠিক তখনই দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেল পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় তিনি ইজিবাইক থেকে সড়কে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
মোস্তফার বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের উত্তর রহিমাপুর জয়বাংলা গ্রামে। তাঁর বাবা ইসহাক আলী বহু বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, চলাফেরা করতে অক্ষম। সংসারে জমিজমা বলতে তেমন কিছু নেই। দুই শতক জমির ওপর দুটি টিনের ঘর—এটাই তাদের সব সম্পদ। মোস্তফাই ছিলেন একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি।
তাঁর তিন সন্তান—মামুন, মাওয়া মণি ও ছোট ছেলে আবদুর রহমান—পড়াশোনা করছে। তাদের স্বপ্ন, তাদের ভবিষ্যৎ—সবই মোস্তফার ওপর নির্ভর ছিল। প্রতিদিন ইজিবাইক চালিয়ে যা আয় হতো, সেই সামান্য অর্থ দিয়েই সংসার চলত কোনোমতে। এখন সেই আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে।
দুর্ঘটনার খবরে সন্ধ্যায় বাড়ি ছুটে যান স্থানীয় মানুষজন। পুরো বাড়িতে শোকাবহ পরিবেশ। স্ত্রী আবেদা বেগম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। তিনি বলছিলেন,
“একটুখানি বাজার নিয়া বাড়ি আইবো কইছিল। আইলো লাশ হয়ে… আমার ছাওয়াগুলারে এখন খাওয়ামু কী দিয়া?”
বাবা ইসহাক আলী সন্তানের লাশ দেখে ভেঙে পড়েন। পাশে বসে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন,
“আমার ওষুধ আনবো কে? আমার ছাওয়ার ঘরে ভাত দিবে কে? এই সংসার এখন কেমনে চলবে?”
মা মোসলেমা বেগমও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বারবার বলছিলেন,
“আমার ছেলেটা তো কেমনে মরল? ছোট ছোট নাতিগুলো এখন কয়নে বাঁচবে?”
স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান—মোস্তফা ছিলেন বিনয়ী ও পরিশ্রমী। সারা দিন কষ্ট করে আয় করলেও কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। তাঁর মতো একজন মানুষের মৃত্যুতে পুরো গ্রামই শোকে ডুবে গেছে।
ইউপি সদস্য মোনায়েম খান বলেন,
“এই পরিবার পুরোপুরি মোস্তফার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন তারা নিঃস্ব হয়ে গেল। সরকারের বা সমাজের পক্ষ থেকে সাহায্য না পেলে তাদের সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে।”
দুর্ঘটনার পর পুলিশ মোটরসাইকেলটি জব্দ করেছে। হাইওয়ে থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।”
এই দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছেন—সড়কে নিরাপত্তা কোথায়? কেন প্রতিদিন সাধারণ মানুষের জীবনহানি ঘটছে? অদক্ষ বা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এখন সড়কে মৃত্যুর বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোলাম মোস্তফা একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন, তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাঁর পরিবারের সামনে এখন টিকে থাকার লড়াই, তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম। তাঁদের এই সংগ্রামে সহায়তা করা সমাজ ও প্রশাসনের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোস্তফা নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন—সন্তানেরা লেখাপড়া শিখবে, ভালো থাকবে—এখন সমাজের সহায়তার ওপর নির্ভর করছে।