খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলা সঙ্গীতের বিশাল আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র থাকে, যারা নিঃশব্দে আলো ছড়িয়ে দেন, এবং তাদের উজ্জ্বলতা তখনই উপলব্ধি করা হয় যখন তারা আমাদের থেকে হারিয়ে যায়। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন এমনই এক দীপ্তিমান আত্মা—নিরব, স্থির কিন্তু চিরকাল আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন। তার অনুপস্থিতি শুধুমাত্র শূন্যতা নয়, বরং বাংলা সঙ্গীতের এক বিরল দিকের ক্ষতি।
১৩ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে চন্দন নগরে জন্মগ্রহণ করা মুখোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা সঙ্গীতে এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখেছেন। তার সঙ্গীত যাত্রার সূচনা ঘটে ১৯৬৩ সালে, যখন ‘মেগাফোন’ লেবেলে তিনি প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেন, যা সুধীন দাশগুপ্তের সুর ও গানের কথায় রচিত। পরবর্তী বছর তিনি সলিল চৌধুরীর সুর ও কথায় দ্বিতীয় অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এভাবেই তার সঙ্গীত যাত্রা শুরু হয়ে যায়, যা দশকজুড়ে বাংলার শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এরপর থেকে তার গান ধারাবাহিকভাবে মেগাফোন ও এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয়, প্রতিটি সুর ও লয় যেন অনুভূতি ও শিল্পের এক অন্তর্নিহিত প্রকাশ।
মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ, গানের কথা ও সুর বাংলা সঙ্গীতের সোনালি সময়ে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি ছিলেন সঙ্গীতের এক বিরল বহুমুখী প্রতিভাধর—একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। যদিও তার রেকর্ড করা গান সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, প্রতিটি গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অম্লান প্রভাব ফেলে।
১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে যখন বহু সংবেদনশীল সঙ্গীতপ্রেমী হারিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মুখোপাধ্যায় ছিলেন সেই চিরস্থায়ী আলোযাত্রার এক দৃষ্টান্ত। জনপ্রিয়তার প্রলোভনে তিনি কখনও মুগ্ধ হননি; তার জীবন অতীত ছিল নিখাদ আবেগ ও নিখুঁত সঙ্গীতের সাধনার এক অবিচল অনুসরণ।
“বাধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায় বিনা কারণে” এর মতো গানগুলো জীবনের অমীমাংসিত যন্ত্রণা ও অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করে। তার সৃষ্টি আজও বাংলা মানুষকে শুধু গান নয়, মানবতার প্রতি ভালোবাসা শেখায়। রবীন্দ্রপরবর্তী সময়ে তিনি বাংলা গানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন এবং সোনালি যুগের সঙ্গীতের সঙ্গে এক অনন্য সেতুবন্ধন স্থাপন করেন।
যদিও জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে আমাদের ছেড়ে যান, তার সুর, সৃষ্টিশীলতা এবং প্রতিটি নোটে গাঁথা অনুভূতি চিরন্তন। বাংলার হৃদয় এবং বাংলা সঙ্গীতের আত্মায় তার নাম চিরজীবী—চিরস্থায়ী শিল্প, নীরব শ্রদ্ধা এবং অমর স্নেহের প্রতীক।