খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
ফুকুশিমার ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ বছর পর জাপান আবারও বড় পরিসরে নিউক্লিয়ার শক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া’ পুনরায় চালুর চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে দেশটি। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) আঞ্চলিক ভোটের মাধ্যমে এই অনুমোদন দেওয়া হয়, যা জাপানের জ্বালানি নীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।
কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া প্ল্যান্ট টোকিও থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। ২০১১ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর নিরাপত্তাজনিত কারণে জাপানের ৫৪টি পারমাণবিক রিয়েক্টরই বন্ধ করা হয়েছিল। সেই সময় ফুকুশিমা দাইইচি প্ল্যান্টে বিপুল ক্ষতি হয়, যা চেরনোবিলের পর সবচেয়ে বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই ঘটনার পর দীর্ঘদিন দেশটিতে নিউক্লিয়ার শক্তি নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও নীতি সংশোধনের ধারা চলে।
বর্তমানে জাপানের ৩৩টি সচল রিয়েক্টরের মধ্যে ১৪টি পুনরায় চালু করা হয়েছে। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া প্ল্যান্ট পুনরায় চালু হলে এটি হবে টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) পরিচালিত প্রথম প্ল্যান্ট, যারা ফুকুশিমার ক্ষতিগ্রস্ত প্ল্যান্টটিও চালাতো। এবার নতুন করে চালুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তার অতিরিক্ত নিশ্চয়তা আনতে চায়।
সোমবার নিইগাতা প্রিফেকচারের আইনসভায় গভর্নর হিদেও হনাজুমির প্রতি সমর্থন জানিয়ে অনুমোদন পাস হয়। তবে ভোট হলেও স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইনসভা ভবনের বাইরে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রচণ্ড শীতেও বিক্ষোভ করেন।
টেপকো জানিয়েছে, প্ল্যান্টের সাতটি রিয়েক্টরের মধ্যে প্রথমটি ২০ জানুয়ারি পুনরায় চালুর কথা বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কোম্পানির মুখপাত্র মাসাকাতসু তাকাতা বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। নিইগাতার মানুষের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
তবে বাস্তবতা হচ্ছে—অনেক বাসিন্দাই এখনও আতঙ্কমুক্ত নন। গত অক্টোবরের জরিপে দেখা যায়, ৬০% বাসিন্দা মনে করেন না যে পুনরায় চালুর উপযুক্ত শর্ত তৈরি হয়েছে। এমনকি ৭০% মানুষ নতুন প্ল্যান্ট চালুর ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ফুকুশিমার দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগী আয়াকো ওগা বলেন, “আমরা ব্যক্তিগতভাবে জানি পারমাণবিক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কেমন হতে পারে। সেই যন্ত্রণা আর কোনো মানুষকে ভোগ করতে হবে—এটা আমরা চাই না।”
জাপানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, কেবল প্রথম রিয়েক্টরটি চালু হলেই টোকিও অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ২% বৃদ্ধি পাবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি নিউক্লিয়ার শক্তিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যয় কমানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখছেন।
এলএনজি ও কয়লাসহ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে জাপান প্রতি বছর প্রায় ১০.৭ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ ৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে থাকে। সেই ব্যয় কমাতে নিউক্লিয়ার শক্তির বিকল্পকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্ল্যান্টের নাম | কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া |
| অবস্থান | টোকিও থেকে ২২০ কিমি উত্তর |
| মোট রিয়েক্টর | ৭টি |
| প্রথম রিয়েক্টর চালুর সম্ভাব্য তারিখ | ২০ জানুয়ারি |
| স্থানীয় সমর্থন | জরিপে ৬০% বিরোধিতা |
| বিদ্যুৎ বাড়ার সম্ভাবনা | টোকিওতে ২% |
| জীবাশ্ম জ্বালানিতে বার্ষিক ব্যয় | ১০.৭ ট্রিলিয়ন ইয়েন |
নিউক্লিয়ার শক্তিতে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে জাপান কঠিন বাস্তবতা, জনমতের উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক চাপ—সবকিছুর মধ্যেই ভারসাম্য খুঁজছে। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া প্ল্যান্ট পুনরায় চালু হলে দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে—তবে ফুকুশিমার ক্ষত এখনও অনেককে শঙ্কিত করে রেখেছে।