খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ)-এর সাম্প্রতিক বার্ষিক সাধারণ সভায় ২০২৪ সালের বীমা খাতের একটি বিস্তারিত আর্থিক খতিয়ান উপস্থাপন করা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশের বেসরকারি লাইফ ও নন-লাইফ বীমা খাতের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে সামগ্রিক সম্পদ ও তহবিলের স্থিতিশীলতা প্রকাশ পেলেও প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মিশ্র প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি দেশের বীমা শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার এক স্বচ্ছ দর্পণ হিসেবে কাজ করছে।
লাইফ বীমা খাতের আর্থিক চালচিত্র
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয়ে ২০২৪ সালে সামান্য মন্দা দেখা দিয়েছে। ২০২৩ সালে এই খাতে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১১৫,১০৭ মিলিয়ন টাকা, যা ২০২৪ সালে প্রায় ১ শতাংশ কমে ১১৩,৮৯৭ মিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে প্রিমিয়াম আয়ে সামান্য ভাটা পড়লেও লাইফ ফান্ডের আকার বৃদ্ধি পাওয়া এই খাতের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। ২০২৩ সালে ৩১৯,১৮২ মিলিয়ন টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে লাইফ ফান্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩২,৩২২ মিলিয়ন টাকায়। এটি গ্রাহকদের আমানত ও বীমা তহবিলের সুরক্ষার একটি শক্তিশালী প্রমাণ।
নন-লাইফ বীমা খাতের অগ্রযাত্রা
লাইফ বীমার বিপরীতে নন-লাইফ বীমা খাতে প্রিমিয়াম সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালের ৪২,৩৫১ মিলিয়ন টাকা থেকে ২০২৪ সালে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ৪৩,৪৯৫ মিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা প্রায় ২.৯০ শতাংশের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। তবে এই খাতে বিনিয়োগের গ্রাফটি সামান্য নিম্নমুখী। ২০২৩ সালে এই খাতের বিনিয়োগ ৫৭,৭২০ মিলিয়ন টাকা থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৫৬,১৪০ মিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে।
নিচে লাইফ ও নন-লাইফ বীমা খাতের ২০২৪ সালের সর্বশেষ আর্থিক চিত্র একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| খাতের বিবরণ | ২০২৩ (মিলিয়ন টাকা) | ২০২৪ (মিলিয়ন টাকা) | প্রবৃদ্ধির ধরন |
|---|---|---|---|
| লাইফ প্রিমিয়াম আয় | ১১৫,১০৭ | ১১৩,৮৯৭ | সামান্য হ্রাস (০.৯৭%) |
| লাইফ ফান্ডের পরিমাণ | ৩১৯,১৮২ | ৩৩২,৩২২ | বৃদ্ধি (৪.১১%) |
| লাইফ খাতের মোট সম্পদ | ৪৪১,৪১১ | ৪৬০,০৪৩ | বৃদ্ধি (৪.২২%) |
| নন-লাইফ প্রিমিয়াম আয় | ৪২,৩৫১ | ৪৩,৪৯৫ | বৃদ্ধি (২.৭০%) |
| নন-লাইফ মোট সম্পদ | ১১৬,৪৯৪ | ১১৯,১৮৭ | বৃদ্ধি (২.৩১%) |
| নন-লাইফ মোট বিনিয়োগ | ৫৭,৭২০ | ৫৬,১৪০ | হ্রাস (২.৭৩%) |
বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
লাইফ বীমা খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২০২৩ সালের ৩৩৪,৬১৩ মিলিয়ন টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে ৩৪২,৯২৯ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। সামগ্রিকভাবে লাইফ ও নন-লাইফ উভয় খাতেই মোট সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া দেশের আর্থিক খাতের সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে লাইফ বীমা খাতের মোট সম্পদ ৪৬০,০৪৩ মিলিয়ন টাকা এবং নন-লাইফ বীমা খাতের সম্পদ ১১৯,১৮৭ মিলিয়ন টাকা, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বীমা খাতের গভীর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইফ বীমা খাতের প্রিমিয়াম আয়ে সামান্য পতন জীবনযাত্রার ব্যয়ের আধিক্য বা গ্রাহকদের নতুন পলিসি গ্রহণে কিছুটা ধীরগতির ইঙ্গিত হতে পারে। অন্যদিকে, নন-লাইফ বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি মূলত আমদানি-রপ্তানি ও শিল্পায়নের স্থিতিশীলতার ফল। তবে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় আরও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে বিআইএ-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে নন-লাইফ খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের এই প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশের বীমা খাত একটি শক্তিশালী আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লাইফ ফান্ড ও সম্পদের এই ক্রমবর্ধমান ধারা ভবিষ্যতে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা বিধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।