খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হবে মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হওয়া অসম ও বিতর্কিত চুক্তিগুলো বাতিলের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিন্তু চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে সরকারের তড়িঘড়ি করে সম্পাদিত ৩০ বছরের চুক্তিটি সেই প্রত্যাশার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। এই চুক্তির প্রক্রিয়া এবং শর্তাবলি গোপন রাখার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা পতিত সরকারের আমলে ভারতের আদানির সঙ্গে হওয়া অস্বচ্ছ বিদ্যুৎ চুক্তির কথাই মনে করিয়ে দেয়। সন্দেহ নেই যে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন জরুরি, কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য এক অশুভ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
২০২৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এপিএম টার্মিনালের মূল কোম্পানি মায়েরস্ক গ্রুপের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে এই প্রকল্পের সূত্রপাত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শুরুতে পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব) কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রতিযোগিতাহীন বেশকিছু চুক্তি বাতিল করলেও লালদিয়া চুক্তির ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে আগের সরকারের পথই অনুসরণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সুইস চ্যালেঞ্জ’ পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে গিয়ে সরকার প্রতিযোগিতার সুযোগ নষ্ট করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো চুক্তির অবিশ্বাস্য গতি; মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং চূড়ান্ত সই সম্পন্ন হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
| কার্যক্রমের ধাপ | তারিখ ও সময়কাল | বিশেষ পর্যবেক্ষণ |
|---|---|---|
| প্রস্তাব দাখিল | ৪ নভেম্বর, ২০২৫ | এপিএম টার্মিনালস থেকে প্রস্তাব গ্রহণ। |
| মূল্যায়ন ও আলোচনা | ৫ – ৮ নভেম্বর | সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও আলোচনা অব্যাহত। |
| বোর্ড ও মন্ত্রণালয় অনুমোদন | ৯ – ১০ নভেম্বর | সিবিএ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দ্রুত সায়। |
| মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন | ১২ নভেম্বর | অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটির চূড়ান্ত সায়। |
| প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন | ১৬ নভেম্বর | চূড়ান্ত প্রশাসনিক সম্মতি প্রদান। |
| আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর | ১৭ নভেম্বর | এলওএ দেওয়ার মাত্র একদিন পর সই। |
একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর বাস্তবায়নকাল পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ের ওপর বিস্তৃত হবে। অথচ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এই চুক্তির বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে। গণতান্ত্রিক উত্তরসূরিদের পাশ কাটিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া কেবল জবাবদিহিতার অভাবকেই স্পষ্ট করে না, বরং এটি অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যেখানে প্রতিবেশী ভারত বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলো পিপিপি চুক্তির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশ সরকার পিপিপি আইন-২০১৫ এর গোপনীয়তা ধারার আশ্রয় নিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে পর্দার আড়ালে রেখেছে। যদিও তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশে কোনো বাধা নেই।
শেষ পর্যন্ত লালদিয়া চুক্তিটি হয়তো দেশের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ভালো হতে পারে, কিন্তু একে ঘিরে যে রহস্য ও গোপনীয়তা তৈরি করা হয়েছে, তা জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। কোনো চুক্তি সই হয়ে গেলে তা জনদলিল হয়ে যায়, ফলে এটি প্রকাশ না করার কোনো আইনি যুক্তি থাকতে পারে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও যদি পূর্ববর্তী সরকারের মতো একই গোপনীয়তাপূর্ণ এবং একতরফা কর্মপন্থা অব্যাহত রাখে, তবে তা গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থী হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে এই চুক্তির মূল শর্তগুলো প্রকাশ করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারগুলোর জন্য এটি কোনো বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে না দাঁড়ায়।