খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে পৌষ ১৪৩২ | ২৮ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
‘আমার প্রাণ যে মানেনা, কিছুই ভালো লাগেনা / কে বাঁশি বাজায়রে, মন কেন নাচায় রে’—গিটার হাতেগানটি গাইছেন এক তরুণ। পাশে বসেমুগ্ধ শ্রোতা হয়ে তাকিয়েআছেন সুবর্ণা মুস্তাফা। পর্দায় ভেসেওঠেন রাইসুল ইসলাম আসাদও নায়লা আজাদ নুপুর। দৃশ্যটি আজওবহু দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।
১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সৈয়দসালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত চলচ্চিত্র‘ঘুড্ডি’–র সেই গানেরশিল্পী ছিলেন হ্যাপী আখন্দ—বাংলা আধুনিক ওব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য নাম।
তখনতার বয়স মাত্র কুড়ি।অথচ এই প্রতিভাবান তরুণেরসংগীতযাত্রা শুরু হয়েছিল আরওঅনেক আগে। ১৯৬০ সালের১২ অক্টোবর ঢাকায় জন্ম নেওয়াহ্যাপী আখন্দ মাত্র তেরোবছর বয়সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরটিএসসিতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেস্পন্দন ব্যান্ডের সঙ্গে কিবোর্ড বাজিয়েদর্শকদের মুগ্ধ করেন। সময়টা১৯৭৩ সাল। সেই কিশোরইপরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেনসংগীতের পাহাড়ি ঝরনা—অবিরাম, স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত।
বড়ভাই, কিংবদন্তি সুরকার ও সংগীতশিল্পীলাকী আখন্দ–এরহাত ধরেই হ্যাপীর আনুষ্ঠানিকসংগীতজগতে প্রবেশ। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রসংগীতে তারঅসামান্য দক্ষতা লক্ষ করেছিলেনলাকী আখন্দ। হ্যাপী শুনতেভালোবাসতেন ল্যাটিন ব্লুজ, জ্যাজ; পাশাপাশিরাশিয়ান, রোমান ও গ্রিকসংগীতেও ছিল তার গভীরআগ্রহ। এই বহুমাত্রিক শ্রবণ-সংস্কৃতিই তার গায়কী ওসংগীতায়োজনে ভিন্নতা এনে দেয়।
মাত্র১৫ বছর বয়সে রেকর্ডকরা ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটিআজ বাংলা গানের একচিরসবুজ অধ্যায়। নওগাঁর ছোট যমুনানদীর ধারে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যারআবেশে লাকী আখন্দের মাথায়আসা সুর থেকেই এইগানের জন্ম। এস এমহেদায়েতের কথায় গানটি রেকর্ডকরেন হ্যাপী। কলকাতায় গিয়ে এই গানশুনে মান্না দে বিস্মিতহয়ে বলেছিলেন—“চমৎকার গলা, দারুণথ্রোয়িং।”
১৯৭৭সালে বিটিভির জনপ্রিয় সংগীতানুষ্ঠান ‘বর্ণালি’–তে গানটি জ্যাজঢঙে পরিবেশন করে হ্যাপী আখন্দরাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন। একইঅনুষ্ঠানে গাওয়া ‘এই পৃথিবীরবুকে আসে যারা’ গানটিওপ্রশংসিত হয়।
১৯৭৯সালে ফিরোজ রশিদের সঙ্গেগড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘মাইলস’।১৯৮২ সালে প্রকাশিত Milesঅ্যালবামটি ছিল বাংলাদেশের প্রথমসম্পূর্ণ ইংরেজি গানের অ্যালবাম।এরপর আসে A Step Further (১৯৮৬)। যদিও তিনিছিলেন দুর্দান্ত গিটারিস্ট, মাইলসে মূলত কিবোর্ডইবাজাতেন হ্যাপী। ১৯৮৬ সালে তিনিব্যান্ডটি ছাড়েন।
হ্যাপীরগানের সবচেয়ে বড় শক্তিছিল তার রিদম সেন্স ও ইমোশনাল থ্রোয়িং। ‘নীল নীলশাড়ি পরে’-তে ব্লুজঘরানার গিটার, ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’-রদার্শনিক আবেশ, কিংবা ‘তুমিআমার প্রথম প্রেমের গান’-এর রোমান্টিক গিটারইন্ট্রো—সবই তাকে আলাদাকরে চিনিয়ে দেয়।
তিনিশুধু শিল্পীই নন, ছিলেন একজননিবেদিত শিক্ষকও। আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, শাফিন আহমেদ, কুমার বিশ্বজিৎথেকে শুরু করে কলকাতারমধু মুখার্জি—অসংখ্য সংগীতশিল্পী তারকাছ থেকে শিক্ষা ওপরামর্শ পেয়েছেন।
তবেসময়টা তার জন্য খুবসহায়ক ছিল না। রকও ব্যান্ড সংগীত তখনও অবমূল্যায়িত।সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাতাকে হতাশ করেছিল।
১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর, মাত্র ২৭ বছর বয়সে, হ্যাপী আখন্দ পৃথিবী ছাড়েন—বাংলা সংগীত হারায়এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।
আজওকাঁধে গিটার ঝুলিয়ে কোনোবোহেমিয়ান তরুণকে দেখলে মনেপড়ে যায় সেই নাম—হ্যাপী আখন্দ।
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ১২ অক্টোবর ১৯৬০, ঢাকা |
| মৃত্যু | ২৮ ডিসেম্বর ১৯৮৭ |
| প্রধান পরিচয় | গায়ক, সুরকার, গিটারিস্ট, কিবোর্ডবাদক |
| উল্লেখযোগ্য গান | আবার এলো যে সন্ধ্যা, কে বাঁশি বাজায় রে, তুমি আমারপ্রথম প্রেমের গান |
| ব্যান্ড | মাইলস (প্রতিষ্ঠাতা সদস্য) |
| সংগীতধারা | ব্লুজ, জ্যাজ, রক |
| স্মরণে | ‘শেষ উপহার’ ক্যাসেট, ‘হ্যাপী টাচ’ ব্যান্ড, ‘হ্যাপী স্কুল অব মিউজিক’ |