খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে শওকত ওসমান একটি স্বতন্ত্র ও দীপ্ত নাম। তিনি ছিলেন এমন একজন লেখক, যাঁর কলমে সাহিত্যের সৌন্দর্য ও সামাজিক প্রতিবাদের ভাষা একাকার হয়ে উঠেছে। অন্যায়, শোষণ ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল নির্ভীক ও প্রখর; মানবিকতা, মুক্তচিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ছিল তাঁর দৃঢ় অবস্থান।
শওকত ওসমানের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সাবল সিংহপুর গ্রামে। শৈশব থেকেই মেধা ও মননে সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং পরে বাংলায় স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। এই বহুমাত্রিক শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তা ও লেখার পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
সাহিত্যজগতে শওকত ওসমান মূলত কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাত হলেও তাঁর সৃষ্টির পরিসর ছিল বহুবিস্তৃত। তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও রাজনৈতিক নিবন্ধ—সব ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন গভীর ছাপ। সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার দম্ভ, স্বৈরাচার ও ভণ্ড ধার্মিকতার নির্মম রূপ তিনি ব্যঙ্গ ও রূপকের মাধ্যমে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘ক্রীতদাসের হাসি’ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য রাজনৈতিক ব্যঙ্গ উপন্যাস হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন কণ্ঠস্বর। ধর্মান্ধতা ও সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রেরণাদায়ক। তাঁর রচনায় বারবার উঠে এসেছে শোষিত মানুষের আর্তনাদ এবং মুক্ত মানুষের প্রত্যাশা।
পেশাগত জীবনে শওকত ওসমান ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। ১৯৪৭ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ অব কমার্সে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেন। শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি ছিলেন শ্রদ্ধেয়, তেমনি একজন অভিভাবকসুলভ পথপ্রদর্শক হিসেবেও ছাত্রদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, পাকিস্তান সরকারের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক—যা তাঁর সৃজনশীলতার ব্যাপ্তি ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল প্রমাণ।
১৯৯৮ সালের ১৪ মে এই মহৎ কথাসাহিত্যিক ইহলোক ত্যাগ করেন। তবে তিনি আজও বেঁচে আছেন তাঁর সাহসী শব্দে, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে এবং মানবমুক্তির স্বপ্নে ভরা লেখনীতে।