খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে পৌষ ১৪৩২ | ৪ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
স্মরণ
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক উজ্জ্বল, ব্যতিক্রমী নক্ষত্র। সমাজবাস্তবতা, ইতিহাসচেতনা ও মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্বকে গভীর শিল্পবোধে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর পুরো নাম আখতারুজ্জামান মুহম্মদ ইলিয়াস।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা জেলার গোটিয়া গ্রামে, তাঁর মাতুলালয়ে। পৈতৃক নিবাস ছিল বগুড়া শহরের নিকটবর্তী চেলোপাড়ায়। তাঁর পিতা বদিউজ্জামান মুহম্মদ ইলিয়াস ছিলেন পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং মুসলিম লীগ সরকারের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি—যার প্রভাব লেখকের জীবনচেতনায় একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বোধের ভিত নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কৃতী। ১৯৫৮ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে বাংলায় বিএ (অনার্স) ও ১৯৬৪ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়—১৯৮৩ সাল পর্যন্ত—সেখানে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক, সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ, মফিজউদ্দীন শিক্ষা কমিশনের বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা কলেজে অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এদেশের প্রগতিশীল, মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি তাঁর ছিল সুস্পষ্ট সহমর্মিতা ও নৈতিক সমর্থন। এই চেতনার প্রতিফলন তাঁর সাহিত্যকর্মে গভীরভাবে লক্ষণীয়।
কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন সমাজের অন্তর্গত টানাপোড়েন, ক্ষমতার রাজনীতি, ইতিহাস ও ব্যক্তিমানুষের সংকটকে শিল্পসম্মত ভাষায় উপস্থাপনের জন্য। তাঁর রচনার সবচেয়ে বড় শক্তি—স্বকীয় বর্ণনারীতি ও সংলাপে জীবন্ত কথ্যভাষার ব্যবহার, যা বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র উচ্চতা।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
অন্যঘরে অন্যস্বর, খোঁয়ারি, দুধভাতে উৎপাত, চিলেকোঠার সেপাই, দোজখের ওম, খোয়াবনামা, সংস্কৃতির ভাঙা সেতু প্রভৃতি।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮২ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। খোয়াবনামা উপন্যাসের জন্য ১৯৯৫ সালে পান সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার এবং ১৯৯৬ সালে কলকাতা থেকে লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ আনন্দ পুরস্কার।
তাঁর রচনা একাধিক ভারতীয় ভাষাসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসটি নাট্যরূপে মঞ্চস্থ হয়েছে এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক বাংলা সাহিত্য বিভাগে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়ে তাঁর সাহিত্যমানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বহন করছে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। তাঁর একমাত্র পুত্র আন্দালিব ইলিয়াস পার্থ বর্তমানে কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলা সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া এই মহীরুহ কথাসাহিত্যিক ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকায় ইহলোক ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়—যা তাঁর সাহিত্যকীর্তির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
শ্রদ্ধা ও গভীর স্মরণে—
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।