খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০২৬
সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবে পরিচিত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা (সারপিন টিলা) এখন পাথরখেকো সিন্ডিকেটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও প্রতিদিনের অভিযানের তোয়াক্কা না করেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এই প্রভাবশালী চক্র। বর্তমানে শতাধিক অবৈধ ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে ৫০ থেকে ৬০ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। দিনের আলোতে চলে ধ্বংসযজ্ঞ, আর রাতের অন্ধকারে সেই পাথর ট্রাক্টরে করে পৌঁছে যায় বিভিন্ন ক্রাসার মেশিনে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, সারপিন টিলা লুটপাটের এই নীল নকশা অত্যন্ত সুসংগঠিত। এক সময় ১০০-১৫০ ফুট উঁচু এই টিলাটি এখন গভীর পুকুর বা ডোবার আকৃতি ধারণ করেছে। দিনের বেলা শ্রমিকরা বড় বড় পাইপ ও শক্তিশালী মোটর তথা বোমা মেশিন দিয়ে নিচ থেকে পাথর তুলে পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্তূপ করে রাখে। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় পরিবহনের কাজ। ট্রাক্টর বা ট্রলিতে করে এই পাথর ভোলাগঞ্জ ও পাড়ুয়া এলাকার ক্রাসার মেশিনগুলোতে সরবরাহ করা হয়।
এই সিন্ডিকেটে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জালিয়ারপাড়, চিকাডহর, ভোলাগঞ্জ ও পাড়ুয়া এলাকার অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি সরাসরি জড়িত। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পদধারী কতিপয় নেতা এই অবৈধ কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের ওপর মহলের চাপের মুখেও এই সিন্ডিকেট কোনোভাবেই দমে যাচ্ছে না।
সারপিন টিলার বর্তমান করুণ দশা ও লুটপাটের চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান পরিস্থিতি ও তথ্য | প্রভাব ও মন্তব্য |
|---|---|---|
| ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি | ১০০টির বেশি অবৈধ ‘বোমা মেশিন’। | টিলার ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত। |
| খননের গভীরতা | ৫০ থেকে ৬০ ফুট পর্যন্ত গভীর গর্ত। | ভূমিধস ও প্রাণহানির উচ্চ ঝুঁকি। |
| লুটের সময়সূচি | দিনে পাথর উত্তোলন ও রাতে পরিবহন। | প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার কৌশল। |
| জড়িত পক্ষ | জালিয়ারপাড়, পাড়ুয়াসহ ৪ এলাকার সিন্ডিকেট। | রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবের অপব্যবহার। |
| প্রশাসনিক ব্যবস্থা | গত ১৫ দিনে অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক। | মূল হোতারা পর্দার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। |
গত বছরের আগস্টে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন র্যাবের একসময়ের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। তাঁর আগমনের পর সিলেটের অন্যান্য কোয়ারি থেকে পাথর চুরি প্রায় বন্ধ হলেও কোম্পানীগঞ্জের সারপিন টিলায় লুটপাট থামানো যাচ্ছে না। সারওয়ার আলম ব্যক্তিগতভাবে টিলা পরিদর্শন করে এর ক্ষয়ক্ষতি দেখে বিস্মিত হন এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বোমা মেশিন ধ্বংস করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয়। আটককৃতদের অধিকাংশই সাধারণ শ্রমিক হওয়ায় সিন্ডিকেটের মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, সারপিন টিলায় পাথর লুট বন্ধে তাঁরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা ৪৭ জন মূল হোতার নামে মামলা দায়ের করেছি। তবে প্রভাবশালী এই ব্যক্তিরা বর্তমানে এলাকা ছাড়া থাকায় তাঁদের গ্রেপ্তার করতে কিছুটা সময় লাগছে।” এলাকাটির অধিকাংশ মানুষ পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে জড়িত হওয়ায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকায় এই লুটপাট পুরোপুরি বন্ধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশবাদীরা মনে করেন, অনতিবিলম্বে টিলার চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি এবং অবৈধ ক্রাসার মেশিনগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ না করলে এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব হবে। পাথর লুটের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূমিধসে শ্রমিকের মৃত্যু হওয়ার ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে গেছে।