খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানের মাটিতে জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গণবিক্ষোভ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে প্রান্তিক শহরগুলো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ ধারণ করছে। গত রোববার নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে নতুন করে দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি মানুষ। নিহতদের তালিকায় যেমন সাধারণ বিক্ষোভকারী রয়েছেন, তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানির খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে, যার ফলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৮ ডিসেম্বর, যখন তেহরানের সাধারণ ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ রেখে ধর্মঘট শুরু করেন। হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, রোববারের রাতভর বিক্ষোভে তেহরান, শিরাজ এবং পশ্চিম ইরানের কুর্দি ও লোর অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে স্লোগানের ধরন বদলে গেছে। শুরুর দিকে আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্বের পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা সরাসরি বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে, যা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্য এক বড় রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে।
নিচে চলমান বিক্ষোভের বর্তমান চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতির একটি পরিসংখ্যান সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান পরিসংখ্যান ও তথ্য |
|---|---|
| বিক্ষোভ শুরুর তারিখ | ২৮ ডিসেম্বর |
| মোট প্রাণহানি | ১২ জন (বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা সদস্যসহ) |
| আহতের সংখ্যা | ৩০ জনের বেশি |
| মোট গ্রেপ্তার | ৫৮২ জন |
| আক্রান্ত প্রদেশ ও শহর | ২৩টি প্রদেশ এবং ৪০টি শহর |
| আন্দোলনের মূল কারণ | জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট |
| সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ | মাসে ৭ ডলার সমপরিমাণ ভাতা (৪ মাসের জন্য) |
২০২২-২৩ সালের ‘মাসা আমিনি’ আন্দোলন কিংবা ২০০৯ সালের নির্বাচন-পরবর্তী গণজাগরণের মতো এই আন্দোলন এখনো দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ না পেলেও এটি সরকারকে চরম চাপে রেখেছে। বিশেষ করে জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ শাসনামলে এমন বহুমুখী সংকট আগে দেখা যায়নি। সংকট মোকাবিলায় সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি আগামী চার মাসের জন্য নাগরিকদের জন্য নামমাত্র ভাতার ঘোষণা দিলেও তা জনগণের মধ্যে খুব একটা আশার সঞ্চার করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই বিক্ষোভ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইরান সরকারকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বা প্রাণহানি অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এএফপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৩টি প্রদেশের প্রায় ৪০টি শহরে এই আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছে গেছে। অর্থনৈতিক সংস্কারের কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই বিক্ষোভ আরও ভয়াবহ মোড় নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।