খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি ২০২৬
স্মরণ
এদেশের চলচ্চিত্রের ফার্স্ট লেডি
সুমিতা দেবী
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে যে ক’জন নারী শিল্পী পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছেন, সুমিতা দেবী তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তিনি একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রথিতযশা অভিনয়শিল্পী ও সফল চলচ্চিত্র প্রযোজক—যাঁর জীবন ও কর্ম এদেশের সংস্কৃতিচর্চার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
সুমিতা দেবীর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার দক্ষিণ খল্লি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল হেনা ভট্টাচার্য। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সূত্রে কিংবদন্তি নির্মাতা ফতেহ লোহানীর হাত ধরেই তাঁর নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় সুমিতা—যে নামটি পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রে এক অনন্য মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৬২ সালে ক্ষণজন্মা চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান-এর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলে তাঁর নাম হয় নিলুফার বেগম। তবে শিল্পীসত্তা ও পরিচিতির জায়গায় তিনি আজীবন পরিচিত ছিলেন সুমিতা দেবী নামেই।
পঞ্চাশের শেষভাগ ও ষাটের দশকে ঢাকার চলচ্চিত্র জগতে সুমিতা দেবী ছিলেন একজন অগ্রগণ্য নারী ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৭ সালে ফতেহ লোহানী পরিচালিত ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবনের সূচনা। এই চলচ্চিত্রটি ১৯৬১ সালে শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি লাভ করে—যা সুমিতার শিল্পীজীবনের প্রথম বড় সাফল্য।
এরপর ১৯৬০ সালে তিনি অভিনয় করেন ‘আকাশ আর মাটি’ চলচ্চিত্রে। ধীরে ধীরে তাঁর অভিনয় প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে বাংলা চলচ্চিত্রের বিস্তৃত পরিসরে। প্রায় চার দশকব্যাপী তাঁর অভিনয় জীবন ছিল বহুমাত্রিক ও সমৃদ্ধ।
তিনি দশটিরও অধিক চলচ্চিত্রে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন এবং পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন শতাধিক ছবিতে। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—
কখনো আসেনি, সোনার কাজল, কাঁচের দেয়াল, এই তো জীবন, দুই দিগন্ত, আগুন নিয়ে খেলা, অভিশাপ, এ দেশ তোমার আমার, বেহুলা, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, ওরা ১১ জন এবং আমার জন্মভূমি।
বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে নির্মিত *‘ধূপছাঁও’*সহ পূর্ব পাকিস্তানের একাধিক উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সফল ও সমাদৃত।
অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও তাঁর অবদান স্মরণযোগ্য। তিনি প্রযোজনা করেন আগুন নিয়ে খেলা, মোমের আলো, মায়ার সংসার, আদর্শ ছাপাখানা এবং নতুন প্রভাত—এই পাঁচটি চলচ্চিত্র।
ব্যক্তিজীবনে তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন ফরিদপুরের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা অতুল লাহিড়ী। তবে এই দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুমিতা দেবী ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী। তাঁর কণ্ঠ ও উপস্থিতি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনে সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছিল—এই কারণেই তিনি গর্বের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিতে ভূষিত।
অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬২ সালে অল পাকিস্তান ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯৬৩ সালে নিগার পুরস্কার লাভ করেন। স্বাধীনতার পর অর্জন করেন বাচসাস পুরস্কার ও টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ট্রাব) পুরস্কার।
এছাড়াও ২০০২ সালে তিনি লাভ করেন আগরতলা মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার এবং জনকণ্ঠ গুণীজন ও প্রতিভা সম্মাননা।
পারিবারিকভাবে তিনি দুই সন্তানের জননী। তাঁর বড় ছেলে বিশিষ্ট লেখক ও নাট্যনির্মাতা বিপুল রায়হান। ছোট ছেলে অনল রায়হান একজন সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী; রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে অবস্থিত তিথি ডোর কফি শপ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট-এর স্বত্বাধিকারী।
২০০৪ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলা চলচ্চিত্রের এই অগ্রপথিক নারী চিরবিদায় নেন। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সুমিতা দেবী এক অনিবার্য নাম—এক উজ্জ্বল আলো, যা কখনো নিভে যাওয়ার নয়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।