খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ জানুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতসহ যাবতীয় আপ্যায়ন খরচ বহনের যে পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশন (ইসি) গ্রহণ করেছে, তার তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তকে ‘অপরিণামদর্শী’, ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘স্বার্থের দ্বন্দ্বের’ কারণে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান নির্বাচন কমিশনের এই বিতর্কিত পদক্ষেপ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের রাষ্ট্রীয় অর্থে আতিথেয়তা দেওয়া হলে তা হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। তাঁর মতে, যারা নির্বাচন কমিশনের আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন, তারা কতটা স্বাধীন ও নির্মোহভাবে কমিশনের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে পারবেন, তা নিয়ে জনমনে গুরুতর সন্দেহ দেখা দেবে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে তারা কার্যত ‘ভাড়াটে’ পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
নিচে ইসির সিদ্ধান্ত ও টিআইবির আপত্তির প্রধান দিকগুলো সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| আলোচনার বিষয় | নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যুক্তি ও পরিকল্পনা | টিআইবির পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ |
|---|---|---|
| সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য | নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। | এটি একটি ঠুনকো যুক্তি ও অপচয়মূলক পদক্ষেপ। |
| স্বার্থের দ্বন্দ্ব | পর্যবেক্ষকদের কাজ সহজ করতে রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রদান। | আতিথেয়তা গ্রহণকারী ব্যক্তিরা নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে পারবেন না। |
| বৈষম্যের অভিযোগ | কেবল বিদেশি অতিথিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। | দেশি পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা নেই কেন—এটি চরম বৈষম্য। |
| অতীত অভিজ্ঞতা | ২০১৮ ও ২০২৪ সালেও বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। | পূর্ববর্তী এই চেষ্টাগুলো সফল হয়নি বরং বিতর্ক বাড়িয়েছে। |
| জনআকাঙ্ক্ষা | সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। | জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী আকাঙ্ক্ষাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা। |
| আর্থিক উৎস | রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা জনগণের করের টাকা। | রাষ্ট্রের অর্থের অপব্যয় ও নিরপেক্ষতা বিসর্জন। |
টিআইবি আরও প্রশ্ন তুলেছে যে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকদের জন্য কোনো সহায়তার ব্যবস্থা নেই, সেখানে কেবল বিদেশিদের জন্য এই রাজকীয় ব্যবস্থার আয়োজন কেন? ২০০৮ সালের পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে এমন কোনো আতিথেয়তার প্রয়োজন হয়নি উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, বিগত ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিতেই এই ব্যবস্থার চল শুরু হয়েছিল। বর্তমান কমিশন কেন সেই ‘পতিত সরকারের’ পথ অনুসরণ করছে, তা নিয়ে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বিবৃতিতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রতিও বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে। টিআইবি মনে করে, কোনো দেশের সরকার বা নির্বাচন কমিশনের সরাসরি অর্থায়নে পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করা পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার পরিপন্থী। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা কোন যুক্তিতে এ ধরনের আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনমনে যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা রক্ষা করতে কমিশনকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। টিআইবির মতে, ইসির কাজ হলো সব পর্যবেক্ষকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, কাউকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা নয়।