খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বাদশ দিনে পদার্পণ করেছে। পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নেটব্লকস’ এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এবং বহির্বিশ্বে আন্দোলনের চিত্র প্রচার রুখতে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত ও বর্তমান বিস্তার
গত মাসের শেষ দিকে তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাজনিত তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। শুরুতে এটি কেবল ব্যবসায়ীদের আন্দোলন থাকলেও দ্রুত তা সাধারণ মানুষের ক্ষোভে রূপ নেয় এবং দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)-এর তথ্যমতে, গত ১২ দিনে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৫টির প্রায় ৩৪৮টি স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং বর্তমান পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
|---|---|
| বিক্ষোভের স্থায়িত্ব | ১২ দিন (বৃহস্পতিবার পর্যন্ত)। |
| আন্দোলনের কারণ | মুদ্রাস্ফীতি, রিয়ালের দরপতন ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। |
| ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান | অন্তত ২১ জন নিহত (নিরাপত্তা বাহিনীসহ)। |
| বিক্ষোভের বিস্তৃতি | ২৫টি প্রদেশের ৩৪৮টি পৃথক স্থান। |
| সরকারি পদক্ষেপ | দেশজুড়ে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন ও ডিজিটাল সেন্সরশিপ। |
| প্রধান বিক্ষোভস্থল | তেহরান, বুরুজের্দ, আর্সানজান ও গিলান-এ-ঘার্ব। |
| আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া | নেটব্লকস ও এএফপি কর্তৃক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ। |
সহিংসতা ও দমন-পীড়ন
রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করেন। কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী শহর তোনেকাবনে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ও লাঠিচার্জ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, চলমান এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
কর্তৃপক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
সংকট মোকাবিলায় ইরানি কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভিন্নমুখী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অত্যন্ত কঠোর সুর অবলম্বন করে বলেছেন, ‘দাঙ্গাকারীদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে।’
ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেন-এজেই এই বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সমন্বয় করে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
নির্বাসিত নেতৃত্বের আহ্বান
এদিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি নির্বাসন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় সবাইকে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শাসকগোষ্ঠী যখনই ভয় পায়, তখনই তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে।
সব মিলিয়ে ইরান বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে প্রকৃত হতাহতের খবর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা দেশটিতে বড় ধরণের মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি করছে।