খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর আলেপ্পোতে সরকারি বাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর মধ্যে চলমান সংঘর্ষ নতুন করে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। শহরের শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়া এলাকায় সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের ফলে গত কয়েক দিনের মধ্যেই অন্তত এক লাখ ৬২ হাজার মানুষ নিজ নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। জরুরি সেবাবিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-রাজাব এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, আলেপ্পোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।
শনিবার, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সিরীয় সেনাবাহিনী শেখ মাকসুদ এলাকার প্রায় ৫৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় কুর্দি যোদ্ধাদের জন্য ঘোষিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরই সেনাবাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করে। এর আগে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এসডিএফ-এর একীভূতকরণ চুক্তি কার্যকর না হওয়ায় দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় এবং সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথমে ছয় ঘণ্টার একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে কুর্দি যোদ্ধাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত এলাকায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়। তবে আলেপ্পোর কুর্দি কাউন্সিল এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর পরপরই শেখ মাকসুদ এলাকায় বিমান ও ড্রোন হামলা শুরু হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এসডিএফ অভিযোগ করেছে, অভিযানের সময় সরকারি বাহিনী একটি হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যা তারা সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিপরীতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, সংশ্লিষ্ট স্থাপনাটি চিকিৎসাকেন্দ্রের আড়ালে অস্ত্র সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এই পরস্পরবিরোধী দাবির ফলে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বেড়েছে।
সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে অন্তত ২২ জন নিহত এবং ১৭৩ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক বছরের মধ্যে আলেপ্পোতে এটিই সবচেয়ে বড় সহিংসতার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আহমেদ আল-শারা’র নেতৃত্বাধীন সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী কুর্দি বাহিনীকে মূল সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও, গত বছরের মার্চে হওয়া চুক্তি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে পারস্পরিক আস্থাহীনতা বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক সিরীয় সরকারের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলার মন্তব্য করেছেন, সিরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা। অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয় পক্ষকে অবিলম্বে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রও কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে সিরিয়ার শীর্ষ পর্যায় থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, আলেপ্পোতে তথাকথিত ‘অবৈধ সশস্ত্র উপস্থিতি’ নির্মূল না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। এর ফলে ভবিষ্যতে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| গৃহহীন মানুষের সংখ্যা | প্রায় ১,৬২,০০০ |
| নিহত | অন্তত ২২ জন |
| আহত | ১৭৩ জন |
| সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ | শেখ মাকসুদ এলাকার প্রায় ৫৫% |
| সংঘর্ষ শুরুর সময় | ৬ জানুয়ারি থেকে |
এই পরিস্থিতিতে আলেপ্পোর সাধারণ মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তা, আশ্রয় ও চিকিৎসা—সবকিছুই ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে।