খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।”
এই একটি উক্তিতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সুভাষচন্দ্র বসু কতটা তেজস্বী, আপসহীন ও বিপ্লবী নেতা ছিলেন। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন; তিনি ছিলেন এক অগ্নিশিখা, যিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহস, আত্মত্যাগ ও প্রত্যয়ের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
সুভাষচন্দ্র বসু—ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক কিংবদন্তি অধ্যায়। তিনি ইতিহাসে সমধিক পরিচিত নেতাজি নামে।
নেতাজির জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি, বর্তমান ওড়িশা রাজ্যের কটক শহরে। শৈশব থেকেই তাঁর চরিত্রে দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের ছাপ স্পষ্ট ছিল। কটকের স্টিওয়ার্ট স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়ন করেন। ১৯১১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি কলকাতা থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯১৮ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিটজউইলিয়াম হলে ভর্তি হন এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। প্রায় নিয়োগপত্র পেয়েও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন—কারণ একজন শাসকের অধীনে চাকরি নয়, তিনি বেছে নিয়েছিলেন শাসনব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করার পথ। তাঁর ভাষায়—
“কোনো সরকারের সমাপ্তি ঘোষণা করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হলো, সেই সরকার থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া।”
নেতাজি ছিলেন গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ ও আধ্যাত্মিক চেতনায় বিশ্বাসী। স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ তাঁর চিন্তাজগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। রাজনৈতিক জীবনে তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণা ও গুরু ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ—বাংলার উগ্র জাতীয়তাবাদের অন্যতম পথিকৃৎ।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির সঙ্গে মৌলিক মতভেদ পোষণ করতেন। নেতাজির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—শুধু অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করা সম্ভব নয়; সশস্ত্র প্রতিরোধই ভারতের মুক্তির একমাত্র পথ।
এই আদর্শ থেকেই তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পূর্ণ ও অবিলম্বে স্বাধীনতার দাবি তোলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে আতঙ্কিত হয়ে তাঁকে এগারোবার কারারুদ্ধ করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নেতাজি এটিকে ব্রিটিশ শাসনের দুর্বলতার সুযোগ হিসেবে দেখেন। তিনি গোপনে ভারত ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপানে যান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে। জাপানের সহায়তায় তিনি ভারতীয় যুদ্ধবন্দী ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে পুনর্গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ—যার নেতৃত্বে তিনি ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করেন।
নেতাজি পরপর দু’বার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং কংগ্রেসের নীতি নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনার কারণে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। তবু তিনি কখনো তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
ধারণা করা হয়, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানে এক বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে এই তথাকথিত দুর্ঘটনা ও মৃত্যুকে ঘিরে আজও রয়েছে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও বিরুদ্ধপ্রমাণ—যা নেতাজিকে ইতিহাসে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজও আমাদের কাছে শুধু অতীত নন—তিনি সাহস, আত্মত্যাগ ও মুক্তির অনন্ত প্রেরণা।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।