খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে মুসলিম ব্যক্তিরা আইন অনুযায়ী ইচ্ছা করলে জবাবদিহি ছাড়া স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন, যা ‘তালাক’ নামে পরিচিত। তবে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য বিধিমোতাবেক তালাক রেজিস্ট্রি করা এবং চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ প্রেরণ করা বাধ্যতামূলক। চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে সমঝোতা বৈঠকে ডাকার পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু বৈঠক আয়োজন করা না হলে, নোটিশ গ্রহণের তারিখ থেকে তিন মাস অতিবাহিত হলে তালাক আইনত কার্যকর হবে (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৭)।
মুসলিম নারীদের সরাসরি তালাকের অধিকার নেই। তারা শুধুমাত্র স্বামীর অনুমতি পেলে বা আদালতের মাধ্যমে (মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী) বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারেন। তবে বর্তমান প্রথা অনুযায়ী, বেশিরভাগ বিয়ের কাবিননামায় নারীদের জন্য স্বামীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে বাস্তবে নারীরাও চাইলে স্বামীর কাছ থেকে তালাক নিতে পারেন। এই একতরফা, নিয়ন্ত্রণহীন প্রক্রিয়া সমাজে নারীদের জন্য সীমাহীন ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।
নিম্নলিখিত চারটি উদাহরণ দেখায় নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা:
| নাম (ছদ্মনাম) | বয়স | বিবাহকাল | সমস্যা | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|---|---|
| লতিফা বেগম | ৫৫ | ৩০ বছর | স্বামী দ্বারা শারীরিক নির্যাতন | লিগ্যাল এইড অফিসে সমাধানের আশায় |
| কুলসুম আক্তার | ৩৮ | ১৮ বছর | স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে, সম্পত্তি হারানো | বাবার বাড়িতে অসহায় অবস্থায়, আদালতে প্রতিকার চাইছে |
| নাইমা রহমান | ২৫ | ২ বছর | স্বামীর হঠাৎ তালাক | আদালতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, অপরাধবোধ না জানার কারণে মানসিক চাপ |
| সুফিয়া | ৩২ | ১২ বছর | স্বামীর পরকীয়া, সন্তানদের দায়িত্ব | নিজের শ্রম ও সংসার হারিয়ে, সন্তানসহ প্রতিকার আশায় ঘুরছে |
এই ঘটনা দেখায়, নারীদের মোহরানা, ভরণপোষণ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং যৌথ সম্পত্তিতে অধিকার নিশ্চিত না থাকায় তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশ্বে অনেক দেশে বিচ্ছেদের পূর্বে সব পারিবারিক, আর্থিক ও সামাজিক বিষয় সমাধানের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার ‘দ্য ফ্যামিলি ল অব দ্য রিপাবলিক অব ইন্দোনেশিয়া’ অনুযায়ী:
একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অধিকার ও মৌলিক চাহিদা পূরণ বাধ্যতামূলক।
বিবাহকালীন অর্জিত সম্পত্তি স্বামী–স্ত্রীর যৌথ।
আদালত চাইলে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর জন্য ভরণপোষণ ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।
বাংলাদেশেও পারিবারিক আদালত পুনর্গঠিত হয়েছে। প্রতিটি জেলায় পারিবারিক আদালত ও পারিবারিক আপিল আদালত প্রতিষ্ঠিত হলেও, তালাক প্রদানের একতরফা প্রক্রিয়া এখনও নারীদের বিপর্যয় ডেকে আনছে। তালাকের সঙ্গে মোহরানা, সন্তানদের অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ, ক্ষতিপূরণ ও সম্পত্তির সমন্বয় আইনত বাধ্যতামূলক করলে পারিবারিক বিরোধ কমানো সম্ভব হবে।
নারী–শিশুদের মৌলিক মানবিক অধিকার সুরক্ষিত করতে আমাদের আইনি ব্যবস্থায় তালাকের পূর্বে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করার প্রয়োজন অপরিহার্য। স্বামী–স্ত্রীর সমান অধিকার, বিচ্ছেদের পর নির্ধারিত প্রতিকার, সন্তানদের নিরাপত্তা—এগুলো নিশ্চিত না হলে সমাজে নারীর দুর্দশা চলতেই থাকবে। সময় এসেছে আমাদের আইনি কাঠামো নারী–শিশুদের প্রতি দায়বদ্ধ ও মানবিক সমাধান নিশ্চিত করার।