খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস-২০২৬’ পালিত হয়েছে। এই বিশেষ দিনটি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় রাজস্ব ভবনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের সময় বিপুল পরিমাণ চোরাচালানকৃত সোনা, বৈদেশিক মুদ্রা ও মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের বর্তমান শুল্ক কাঠামো, বাণিজ্য নীতি এবং চোরাচালান প্রতিরোধে কাস্টমস বিভাগের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সেমিনারে এনবিআর সদস্য মুবিনুল কবীর মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে গত বছরের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মোট ১২ হাজার ৭৭৪ ভরি সোনা জব্দ করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৬৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। শুধু সোনাই নয়, একই সময়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এবং মাদকদ্রব্যও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়েছে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, সীমান্তে কড়া নজরদারি সত্ত্বেও চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলো সক্রিয় রয়েছে।
২০২৫ সালে কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ জব্দকৃত পণ্যের তালিকা:
| পণ্যের বিবরণ | পরিমাপ/পরিমাণ | বাজারমূল্য (প্রায়) |
| জব্দকৃত সোনা | ১২,৭৭৪ ভরি | ১৬৩.৭৩ কোটি টাকা |
| বৈদেশিক মুদ্রা | – | ১৪৯.৬৫ কোটি টাকা |
| বিদেশি সিগারেট | ২,৪৩,০৯৫ কার্টন | – |
| বিদেশি মদ | ১৫,২৪৬ লিটার | – |
সেমিনারে উপস্থিত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই-এর চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বাংলাদেশের বর্তমান শুল্কনীতিকে ‘জটিল’ বলে অভিহিত করেন। তিনি দ্রুত বাণিজ্যনীতির উদারীকরণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, শুল্ক আদায়ের পরিমাণ জিডিপির ১ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, শুল্কহার অধিক হওয়ার কারণেই অনেক সময় মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পণ্য আমদানির প্রবণতা দেখা দেয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানান, একসময় দেশের রাজস্ব আয়ের ৯০ শতাংশ শুল্ক থেকে আসত, যা বর্তমানে ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি ব্যবসায়ীদের স্বচ্ছতার সাথে ব্যবসা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “অনেকে তুলার ঘোষণা দিয়ে সিগারেট বা মাদক নিয়ে আসেন। সমাজকে মাদক ও ক্ষতিকর পণ্য থেকে রক্ষা করা কাস্টমস বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ব্যবসায়ীরা সঠিক পথে থাকলে বন্দরে পণ্য পরীক্ষার হার কমিয়ে খালাস প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা সম্ভব।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের জন্য কাস্টমস প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন জরুরি বলে তাঁরা মত দেন।
অনুষ্ঠানে এনবিআর-এর পক্ষ থেকে ৯টি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে ‘অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটর’ (এইও) সনদ প্রদান করা হয়। এই সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্দরে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার এবং দ্রুত সেবা পাবে। বর্তমানে এইও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি ২৫০-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসে এনবিআর-এর প্রকাশিত তথ্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, চোরাচালান প্রতিরোধে কাস্টমস বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে কেবল অভিযান নয়, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং শুল্কনীতির যৌক্তিক সংস্কারের মাধ্যমেই দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব। ব্যবসায়ীদের স্বচ্ছতা এবং কাস্টমস বিভাগের আধুনিকায়নই পারবে এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ জয় করতে।