খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
জাল নথির মাধ্যমে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুটবল দলে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাঁদের দিয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলানোর অভিযোগে দেশটির ফুটবল অঙ্গনে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মালয়েশিয়ার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএএম)-এর পুরো নির্বাহী কমিটি একযোগে পদত্যাগ করেছে, যা দেশটির ক্রীড়া প্রশাসনে বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বুধবার তীব্র সমালোচনা, গণমাধ্যমের নজরদারি এবং ফিফা ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) চাপের মধ্যে এফএএমের নির্বাহী কমিটি তাদের পদ ছাড়ার ঘোষণা দেয়। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইউসুফ মাহাদি এক বিবৃতিতে বলেন, এই পদত্যাগের মূল লক্ষ্য হলো সংস্থাটির সুনাম ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষা করা এবং চলমান সংকট যাতে পুরো মালয়েশিয়ান ফুটবলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, তা নিশ্চিত করা। তাঁর ভাষায়, নির্বাহী কমিটির সরে দাঁড়ানো ফিফা ও এএফসিকে এফএএমের শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা স্বাধীনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দেবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৫–২০২৯ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত এই নির্বাহী কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় সর্বসম্মতিক্রমে ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছে। তাদের দাবি, বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাগুলোর আস্থা ফেরানোর স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংকটের সূত্রপাত হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে, যখন বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা সাতজন বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়কে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। অভিযোগ ছিল, মালয়েশিয়ান বংশোদ্ভূত দাবি করে তাঁদের নাগরিকত্বসংক্রান্ত জাল নথি জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এফএএমকে চার লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়। এফএএম এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেও ফিফার একটি কমিটি তা খারিজ করে দেয় এবং সংস্থাটির বিরুদ্ধে ‘কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার’ অভিযোগ তুলে একটি কঠোর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে এফএএমের শাসনব্যবস্থা ও নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর এফএএম সুইজারল্যান্ডের কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টসে (সিএএস) আপিল করে। আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সিএএস ফিফার আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করে, ফলে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়রা জাতীয় দলের হয়ে খেলার অনুমতি পান। এই সুযোগে তাঁরা ২০২৭ এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বের একটি ম্যাচে অংশ নেন, যেখানে মালয়েশিয়া ভিয়েতনামকে ৪–০ গোলে পরাজিত করে। তবে ওই ম্যাচের ফল ঘিরেই নতুন করে অভিযোগ ওঠে এবং তদন্ত আরও জোরদার হয়।
ফিফার তথ্যমতে, খেলোয়াড়দের নাগরিকত্বসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে গত মাসে মালয়েশিয়ার তিনটি ম্যাচের ফল বাতিল করা হয়েছে। এই তিন ম্যাচকে ৩–০ গোলে পরাজয় হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এফএএমকে ১০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি আপিলযোগ্য হলেও এর ফলে মালয়েশিয়ান ফুটবলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই কেলেঙ্কারি দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সমর্থকরা যেমন বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, তেমনি কয়েকজন আইনপ্রণেতাও এফএএম এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন। তাঁদের মতে, শুধু ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নয়, যেসব দপ্তর বিতর্কিত নাগরিকত্ব অনুমোদন দিয়েছে, তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নিষিদ্ধ খেলোয়াড়ের সংখ্যা | ৭ জন |
| ফিফার প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা | ১২ মাস |
| এফএএমের জরিমানা | ৪ লাখ মার্কিন ডলার |
| বাতিল ম্যাচ | ৩টি |
| সাময়িকভাবে খেলার অনুমতি | সিএএসের স্টে অব এক্সিকিউশন |
| সংশ্লিষ্ট দেশ | আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস, স্পেন |
সব মিলিয়ে, এই ঘটনা শুধু একটি ক্রীড়া কেলেঙ্কারি নয়; এটি মালয়েশিয়ার ফুটবল প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিএএসের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় থাকলেও, নির্বাহী কমিটির পদত্যাগ স্পষ্ট করে দিয়েছে—সংকটের অভিঘাত এফএএমের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।