খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
ফেনীতে অপহরণের পর ধরা পড়ার আশঙ্কায় এক স্কুলছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনায় আদালত তিন যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এই রায়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের পাশাপাশি স্বস্তির অনুভূতিও ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে নিহত শিশুটির পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে। আদালত বলেছেন, অপরাধের নৃশংসতা, পরিকল্পিত চরিত্র এবং শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে এমন কঠোর শাস্তি অনিবার্য।
ঘটনার দিন ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর। অন্য দিনের মতো কোচিং শেষ করে বাড়ি ফিরছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আল মাঈন (১০)। ফেরার পথেই সে অপহরণকারীদের ফাঁদে পড়ে। কিছু সময়ের মধ্যেই অপহরণকারীরা আহনাফের বাবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা যখন ছেলেকে নিরাপদে ফেরত পাওয়ার আশায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তখনই ভয়াবহ মোড় নেয় ঘটনা।
তদন্তে উঠে আসে, অপহৃত অবস্থায় আহনাফ অপহরণকারীদের একজনকে চিনে ফেলেছিল। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা শিশুটিকে বাঁচিয়ে না রেখে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে তার মরদেহ লুকিয়ে রাখা হয় ফেনী সদর উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ রেললাইনের পাশের একটি ডোবায়। চার দিন পর, ১২ ডিসেম্বর পুলিশ সেখান থেকে আহনাফের মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা মাঈন উদ্দিন বাদী হয়ে থানায় হত্যা ও অপহরণ মামলা করেন। মামলার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়, যা একই বছরের ২৫ মে গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ২২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হয়।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) এ এন এম মোরশেদ খান রায়ে বলেন, শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি এবং পরে হত্যার মতো অপরাধ সমাজে ভয়াবহ বার্তা দেয়। এ ধরনের অপরাধ দমনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় তিন আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন হলেন—আশরাফ হোসেন চৌধুরী (২০), মো. মোবারক হোসেন (২০) ও ওমর ফারুক (২০)। আশরাফ ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মোবারক পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক এবং ওমর ফারুক লক্ষ্মীপুর জেলার বাসিন্দা।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি মো. শাহাব উদ্দিন আহাম্মদ ও সহকারী সরকারি কৌঁসুলি মেজবাহ উদ্দিন খান। আসামিপক্ষে আইনজীবীরা ছিলেন সাব্বির উদ্দিন, কামরুল হাসান ও সামছুদ্দিন মানিক। রায় ঘোষণার সময় সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং রায় শেষে তাদের কড়া নিরাপত্তায় জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আহনাফের বাবা মাঈন উদ্দিন বলেন, “আমার ছোট ছেলের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে—এতে আমি সন্তুষ্ট। দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবি জানাই।”
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নিহতের নাম | আহনাফ আল মাঈন |
| বয়স ও শ্রেণি | ১০ বছর, চতুর্থ শ্রেণি |
| ঘটনা ঘটে | ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ |
| মরদেহ উদ্ধার | ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ |
| মুক্তিপণ দাবি | ১২ লাখ টাকা |
| রায় ঘোষণা | ২০২৬ সালের জানুয়ারি |
| দণ্ড | তিনজনের মৃত্যুদণ্ড |
এই রায় শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে একটি শক্ত বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমাজে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।